দেশের শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদনের গতি আরও মন্থর হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে শিল্প স্থাপন ও উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা এবং নিষ্পত্তি—দুই সূচকেই উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা বিনিয়োগ পরিস্থিতির দুর্বলতাকেই ইঙ্গিত করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাইয়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ কমেছে। এ খাতে এলসি নিষ্পত্তিও কমেছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। শিল্পের উৎপাদনচক্রে ব্যবহৃত কাঁচামালের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা কমেছে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি কমেছে ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ।
ভারী শিল্পের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানিও সংকুচিত হয়েছে। জুলাইয়ে এ ধরনের যন্ত্রপাতির এলসি খোলা প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে এবং নিষ্পত্তির হারও ১০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ স্থবিরতার সঙ্গে সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন শিল্প সম্প্রসারণে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
শিল্প খাতের এই মন্থরতা উৎপাদনেও প্রতিফলিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস’ অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ সময়ে বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন সূচক ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশে নেমে গেছে। এর আগের তিন অর্থবছরেই এ সূচক ইতিবাচক ছিল। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন সূচক ঋণাত্মক ধারায় নেমেছে।
বিনিয়োগে ধীরগতির আরেকটি বড় সূচক হলো বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ। জুন শেষে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীতে একই অর্থবছরে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ, যা বেসরকারি খাতের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অর্থনীতিতে স্থবিরতা কাটিয়ে তুলতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নীতি সুদহারও কমানো হয়েছে। তবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বন্দর সুবিধা ও যোগাযোগ অবকাঠামো নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর হলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও বাড়বে।
তবে সামগ্রিক আমদানির চিত্রে ভিন্ন প্রবণতাও রয়েছে। জুলাইয়ে মোট ৬ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি। এ বৃদ্ধির মূল কারণ জ্বালানি তেল আমদানির এলসি প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং খাদ্যপণ্যের এলসি ২৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া। অর্থাৎ শিল্প খাতের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমলেও জ্বালানি ও খাদ্য আমদানির উচ্চ ব্যয় মোট এলসির পরিমাণ বাড়িয়েছে।
শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ মনে করেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটই বর্তমান বিনিয়োগ স্থবিরতার প্রধান কারণ। তাঁর ভাষ্য, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিল বকেয়া থাকায় ব্যাংকিং খাতও চাপের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না, ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনাও সীমিত।
![]()