স্বাভাবিকের তুলনায় সরবরাহ কমেছে ১৮ শতাংশ
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে গ্যাসের সংকট যখন তীব্র, তখন স্থানীয় উৎপাদনেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগজনক পতন। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ছে। এরই মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাসমান টার্মিনালগুলোতে সংকট ও ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ কমেছে। ফলে বিদ্যুৎ, শিল্প-কারখানা, সার, সিএনজি ও আবাসিক—সব খাতেই সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে এ ক্ষেত্রের উৎপাদন ছিল ৮২০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি। এপ্রিলের অর্ধেক সময়েও উৎপাদন ছিল ৮০৫ থেকে ৮১০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে। অর্থাৎ সাড়ে পাঁচ মাসের ব্যবধানে বিবিয়ানা থেকে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন কমেছে প্রায় ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট।
দেশে উৎপাদনে থাকা সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা থেকে স্থানীয় গ্যাসের প্রায় ৪৫ শতাংশ সরবরাহ আসে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন এ গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনা করছে। কোম্পানিটির অধীনে বিবিয়ানা ছাড়াও মৌলভীবাজার ও জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, বিবিয়ানা থেকে প্রতি মাসেই গড়ে ১২ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন কমছে। দেশের অন্য বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকেও উল্লেখযোগ্য হারে উৎপাদন বাড়ছে না। ফলে বিবিয়ানার উৎপাদন হ্রাস সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করছে।
দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আওতায় রয়েছে ১৭টি গ্যাসক্ষেত্র। এর মধ্যে তিতাস, হবিগঞ্জ, রশিদপুর ও শাহবাজপুরের মতো কয়েকটি ক্ষেত্র উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করছে। অন্য অনেক ক্ষেত্রের উৎপাদন খুবই কম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
এদিকে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ থাকে প্রায় ২ হাজার ৬৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সংকটের মধ্যে গতকাল এ সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ১৭৫ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প ও আবাসিক খাতে সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
গ্যাসের সংকটে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের সব গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৯৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এর ফলে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।
চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারায় মফস্বল এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষি খামার, চাল উৎপাদন ও হিমাগার। একই সঙ্গে গ্যাসের সংকটে সার কারখানাগুলোও স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারছে না।
শিল্প খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে বস্ত্র খাতের অনেক কারখানা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এসব কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দিনের বেলায় গ্যাস না পাওয়া এবং রাতে সীমিত সরবরাহ পাওয়ার কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান রেশনিং করেও উৎপাদন ধরে রাখতে পারছে না।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, দিনের বেলায় কোনো গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, রাতে কিছুটা পাওয়া যাচ্ছে। এভাবে রেশনিং করে বিশেষ করে বস্ত্র কারখানা চালানো সম্ভব নয়। অথচ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত গ্যাস বিল, কর্মীদের বেতন ও ব্যাংকের দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চললে শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বিদেশি ক্রেতারাও বাংলাদেশের গ্যাস সংকট সম্পর্কে জানতে শুরু করেছেন। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি হলে রফতানি শিল্পে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গ্যাস সংকটের আরেকটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এলএনজি সরবরাহে অস্থিরতা। দেশে এলএনজি সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। টানা ২৫ দিনের সংকটের পর গত শনিবার সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হলে সরবরাহ কিছুটা বাড়ে। কিন্তু নতুন এলএনজি কার্গো না থাকায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে আবার সরবরাহ কমতে থাকে। গতকাল বেলা ৩টার দিকে এ টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। নতুন কার্গো পৌঁছানোর পর সরবরাহ আবার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিনের। ২০১৬ সালের পর থেকেই দেশে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ক্রমাগত কমছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। তবে আমদানিনির্ভর এ ব্যবস্থা দেশের জ্বালানি ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও বৈশ্বিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়া এখন একটি বাস্তবতা। গত এক দশকে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি। অথচ এলএনজি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। ২০২৫ সালে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। চলতি বছর এ ব্যয় ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তার মতে, আমদানিতে ব্যয় হওয়া অর্থের একটি অংশ নিয়মিত দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ করা হলে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা এড়ানো সম্ভব হতো।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে অতীতেও নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০২২ সালে ৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এসব কূপ থেকে ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার আশা করা হলেও ৩০টি কূপ খননের পরও প্রত্যাশা অনুযায়ী উৎপাদন পাওয়া যায়নি। বর্তমান সরকার নতুন করে ১০০টি কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, গ্যাস উৎপাদন হ্রাসের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কার্যক্রম নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি কূপের খনন ও ওয়ার্কওভার শেষ হয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন ধরে রাখা এবং গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোই এখন মূল লক্ষ্য।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এলএনজি আমদানি দিয়ে সাময়িকভাবে সরবরাহ ঘাটতি মোকাবেলা করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই সমাধান নয়। পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধান ও কূপ খননে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার অপচয় কমানো এবং শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগও প্রয়োজন।
কারণ গ্যাসের চাহিদা ক্রমাগত বাড়লেও স্থানীয় উৎপাদন কমছে। অন্যদিকে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বা সরবরাহে সামান্য অস্থিরতাও দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে বড় ধরনের অভিঘাত তৈরি করছে। বিবিয়ানার উৎপাদন কমে যাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল একটি গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সমস্যা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।![]()