ওসমান এরশাদ ফয়েজ, এমডি, ঢাকা ব্যাংক
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত যখন নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করছে, ঠিক সেই সময় নিজেদের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে ঢাকা ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওসমান এরশাদ ফয়েজ বলছেন, তাদের লক্ষ্য শুধু বড় ব্যাংক হওয়া নয়; বরং কর্মদক্ষতা, সুশাসন, গ্রাহকসেবা, প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে দেশের অন্যতম শক্তিশালী বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, আর্থিক প্রবৃদ্ধি, ঋণনীতি, ডিজিটাল রূপান্তর, এসএমই অর্থায়ন, সবুজ অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন তিনি। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ও পরিকল্পনা তুলে ধরা হলো।
আগামী পাঁচ বছরের লক্ষ্য: বড় নয়, আরও শক্তিশালী ব্যাংক
ওসমান এরশাদ ফয়েজের মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য আগামী পাঁচ বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টাকে তিনি শুধু প্রবৃদ্ধির নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগত শক্তি গড়ে তোলার সময় হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন,
“আমাদের লক্ষ্য দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক হওয়া। তবে সেটা শুধু আকারে বড় হয়ে নয়; বরং কর্মক্ষমতা, গ্রাহকের অভিজ্ঞতা, স্থিতিস্থাপকতা ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে।”
তাঁর ভাষায়, ঢাকা ব্যাংকের করপোরেট ব্যাংকিং দীর্ঘদিনের শক্তিশালী ভিত্তি হলেও এখন ব্যাংকটি করপোরেট, এসএমই, রিটেইল, কৃষি ও টেকসই অর্থায়ন—সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধি গড়ে তুলতে চায়।
২০২৫ সালের সাফল্য: সংখ্যার চেয়ে বড় ছিল গ্রাহকের আস্থা
গত বছরের আর্থিক ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও ওসমান এরশাদ ফয়েজ বলছেন, সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল গ্রাহকের বিশ্বাস ধরে রাখা।
২০২৫ সালে ঢাকা ব্যাংকের কর-পূর্ব মুনাফা দাঁড়ায় ৬০১ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ব্যাংকের আমানত বেড়েছে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ।
এ বিষয়ে তিনি বলেন,
“যে সময়ে পুরো ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট ছিল, সেই সময় আমাদের আমানতের এই প্রবৃদ্ধি শুধু একটি আর্থিক সূচক নয়। এটি আমাদের গ্রাহকদের অব্যাহত বিশ্বাসের প্রতিফলন।”
তিনি মনে করেন, একটি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ মূলধন নয়—গ্রাহকের আস্থা।
ঋণ দেওয়ার আগে কী দেখে ঢাকা ব্যাংক?
ঋণ বিতরণে জামানতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিবর্তে ব্যবসার প্রকৃত সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা ব্যাংক।
ওসমান এরশাদ ফয়েজ বলেন,
“আমরা ঋণ দেওয়ার সময় শুধু জামানত দেখি না। আমরা ব্যবসার শক্তি, ব্যবস্থাপনার মান, আর্থিক ভিত্তি এবং টেকসই নগদ প্রবাহ তৈরির সক্ষমতা মূল্যায়ন করি।”
তাঁর মতে, দায়িত্বশীল ঋণনীতিই ভালো সম্পদমান নিশ্চিত করে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ—যা এই শৃঙ্খলারই ফল।
তিনি আরও বলেন,
“টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য সম্পদের মান, মূলধনের শক্তি এবং দায়িত্বশীল ঋণ বিতরণে আমরা কোনো আপস করব না।”
ডিজিটাল ব্যাংকিং মানে শুধু অ্যাপ নয়
প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং নিয়ে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে একমত নন ঢাকা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী।
তিনি বলেন,
“ডিজিটাল রূপান্তর মানে আরও বেশি অ্যাপ বা প্ল্যাটফর্ম চালু করা নয়। এর অর্থ হলো ব্যাংকিংকে সত্যিকার অর্থে সহজ, দ্রুত এবং আরও সুবিধাজনক করে তোলা।”
তিনি চান, একজন গ্রাহক হিসাব খুলতে, ঋণের আবেদন করতে কিংবা দৈনন্দিন লেনদেন করতে গিয়ে কম কাগজপত্র পূরণ করবেন, কমবার শাখায় যাবেন এবং অনেক কম সময়ে সেবা পাবেন।
২০২৫ সালের শেষে ঢাকা ব্যাংক গো প্লাস প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ১ লাখ ৭১ হাজার ছাড়িয়েছে। তাঁর মতে, এটি ডিজিটাল ব্যাংকিং গ্রহণে গ্রাহকদের বাড়তি আগ্রহের প্রমাণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে বদলে দেবে ব্যাংকিং?
ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন ওসমান এরশাদ ফয়েজ।
তিনি বলেন,
“ঋণ মূল্যায়ন, জালিয়াতি শনাক্তকরণ এবং গ্রাহকভিত্তিক ব্যক্তিগত আর্থিক সমাধান তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
তবে তাঁর মতে, প্রযুক্তি কখনো মানবিক বিচারবোধের বিকল্প নয়; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও দক্ষ ও নিরাপদ করার একটি মাধ্যম।
এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় ৩০ শতাংশ আসে সিএমএসএমই খাত থেকে। অথচ বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তা এখনও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার বাইরে।
এই বাস্তবতায় ঢাকা ব্যাংক চালু করেছে ই-ঋণ প্ল্যাটফর্ম।
ওসমান এরশাদ ফয়েজ বলেন,
“আমরা ই-ঋণের মাধ্যমে এসএমই ঋণের আবেদন ও মূল্যায়ন ডিজিটাল করছি, যাতে উপযুক্ত উদ্যোক্তারা আরও দ্রুত ও সহজে অর্থায়ন পেতে পারেন।”
তিনি মনে করেন, শুধু প্রচলিত জামানত নয়; ডিজিটাল লেনদেনের তথ্যও ভবিষ্যতে ঋণযোগ্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
“বাংলা কিউআর ও ঢাকা পে’র মতো ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ব্যবসায়ীদের লেনদেনের ইতিহাস তৈরি করে। এর মাধ্যমে একটি ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হয়, তা ব্যাংক আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে।”
তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য—
“বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল করা—একটি বাজার থেকে আরেকটি বাজারে।”
কোন কোন খাতে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ?
ঢাকা ব্যাংকের ঋণনীতিতে এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে কয়েকটি সম্ভাবনাময় শিল্পখাত।
ওসমান এরশাদ ফয়েজ বলেন, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপ্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনশিল্প এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি আগামী দিনের বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নির্ধারণ করবে।
তবে তৈরি পোশাক শিল্পকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন,
“পোশাক খাতের পরবর্তী প্রবৃদ্ধি আসতে হবে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং অধিকতর স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনের মাধ্যমে। তবেই বাংলাদেশ শিল্পশৃঙ্খলে আরও বেশি মূল্য সংযোজন করতে পারবে।”
জলবায়ু ঝুঁকি মানেই আর্থিক ঝুঁকি
সবুজ অর্থায়নকে এখন আর আলাদা কোনো সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন না তিনি।
ওসমান এরশাদ ফয়েজের ভাষায়,
“জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত ঝুঁকির সরাসরি আর্থিক প্রভাব রয়েছে। তাই আমরা জলবায়ু ঝুঁতিকেই ঋণঝুঁকি হিসেবে দেখি।”
২০২৫ সালে ঢাকা ব্যাংকের সবুজ অর্থায়নের পোর্টফোলিও দাঁড়িয়েছে ৬৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫৮০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে সবুজ অর্থায়নে।
পরিষ্কার জ্বালানি, টেকসই অবকাঠামো, সম্পদ-সাশ্রয়ী শিল্প এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষিতে আরও বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তিই সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি
একটি ব্যাংকের সাফল্য শুধু মুনাফা দিয়ে বিচার করা উচিত নয় বলে মনে করেন ওসমান এরশাদ ফয়েজ।
তিনি বলেন,
“একটি ব্যাংকের সাফল্য শুধু আর্থিক ফলাফল দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। এটি কত মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।”
তাঁর মতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এমন ব্যবসায় অর্থায়ন, নতুন উদ্যোক্তাকে সহায়তা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা এবং কৃষক পরিবারকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা—এসবই ব্যাংকের দায়িত্ব।
বর্তমানে ঢাকা ব্যাংকের ২৮৩টি সার্ভিস পয়েন্ট রয়েছে, যা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেশের আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দিচ্ছে।
নারী উদ্যোক্তা, তরুণ ব্যবসায়ী, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোগকে তিনি এই যাত্রার অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন।
সাইবার নিরাপত্তা: ডিজিটাল আস্থার ভিত্তি
ব্যাংকিং যত ডিজিটাল হচ্ছে, নিরাপত্তাও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এ বিষয়ে তিনি বলেন,
“সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার এখন ব্যাংকিংয়ের মৌলিক বিষয়।”
তিনি জানান, ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ, হুমকি শনাক্তকরণ, নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক জালিয়াতি নজরদারির মাধ্যমে ঢাকা ব্যাংক তাদের সাইবার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করছে। পাশাপাশি কর্মীদের প্রশিক্ষণেও বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী ওসমান এরশাদ ফয়েজ।
তিনি বলেন,
“বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত, উদ্যোক্তা মনোভাব, দ্রুত ডিজিটাল গ্রহণ এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনভিত্তিক উৎপাদনের দিকে অগ্রযাত্রা—এসবই আর্থিক খাতের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করছে।”
তাঁর মতে, এখন ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব হলো প্রযুক্তির দক্ষতা, মানবিক বিচারবোধ, সুশাসন এবং দীর্ঘদিনের গ্রাহকসম্পর্ক—এই চারটি শক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগানো।
শেষ পর্যন্ত তিনি বলেন,
“আমরা ঋণশৃঙ্খলা বজায় রাখতে চাই, ডিজিটাল সংযুক্তি ত্বরান্বিত করতে চাই, টেকসই অর্থায়ন বাড়াতে চাই, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি গভীর করতে চাই এবং সুশাসন আরও শক্তিশালী করতে চাই। প্রযুক্তির দক্ষতা ও ভালো ব্যাংকিংয়ের অভিজ্ঞতাকে একত্র করতে পারলে আমরা এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারব, যা বাংলাদেশের সঙ্গে একসঙ্গে এগিয়ে যাবে এবং গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার ও অর্থনীতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী মূল্য সৃষ্টি করবে।”