বিশ্বের ব্যয়বহুল এক্সপ্রেসওয়েগুলোর কাতারে ঢাকা-আশুলিয়া, কিন্তু সুবিধায় পিছিয়ে
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্মিত আধুনিক এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের তুলনায় নির্মাণ ব্যয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে অন্যতম ব্যয়বহুল প্রকল্পে পরিণত হলেও অবকাঠামোগত সুবিধা, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার দিক থেকে এটি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের পর ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকায়। ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ নির্মাণ ব্যয়ের মধ্যে পড়ছে।
তুলনামূলক তথ্য অনুযায়ী, চীনের ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ইবিন-পানঝিহুয়া এক্সপ্রেসওয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই এলিভেটেড। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় বিপুলসংখ্যক সেতু ও টানেল নির্মাণের পরও এর কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৬৫ কোটি টাকা। মালয়েশিয়ার দামানসারা-শাহ আলম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা। এতে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নয়েজ ব্যারিয়ার, উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং ১৩টি ইন্টারচেঞ্জসহ আধুনিক নানা সুবিধা রয়েছে।
ভারতের প্রথম আট লেনের দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ের কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৩২০ কোটি টাকা। বিমানবন্দরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ নিশ্চিত করতে এতে নির্মাণ করা হয়েছে ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আট লেনের টানেল। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার পোর্ট অ্যাকসেস এলিভেটেড হাইওয়ের কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৮৩৭ কোটি টাকা, থাইল্যান্ডের রামা-৩ এক্সপ্রেসওয়েতে ৬১২ কোটি টাকা এবং ইন্দোনেশিয়ার শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ স্কাইওয়েতে প্রায় ৩৯০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
ঢাকা-আশুলিয়া প্রকল্পের আওতায় ২৪ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রায় ১১ কিলোমিটার র্যাম্প, নবীনগর ফ্লাইওভার, বাইপাইল ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ, ১৪ কিলোমিটার এট-গ্রেড সড়ক পুনর্নির্মাণ, একাধিক সেতু, ওভারপাস, আধুনিক ড্রেনেজ, ইউটিলিটি ডাক্ট এবং টোল প্লাজা নির্মাণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয় বেশি হলেও সেই ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্মাণমান, পরিবেশগত সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তার ভাষায়, উন্নত দেশগুলো প্রকল্পের শুরু থেকেই জলবায়ু সহনশীলতা, পরিবেশগত সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণকে নকশার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু বাংলাদেশে পরিবেশগত মূল্যায়ন হলেও বাস্তবায়নের সময় তার কার্যকর প্রয়োগ ও তদারকির ঘাটতি থেকে যায়। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো গড়ে ওঠে না।
ঢাকা মেট্রোরেলের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, শুধু প্রতি কিলোমিটারের ব্যয় দিয়ে কোনো প্রকল্পের মূল্যায়ন করা উচিত নয়। বরং সেই ব্যয়ের বিপরীতে কী ধরনের প্রকৌশলগত মান, পরিবেশগত সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিশ্চিত হয়েছে, সেটিই হওয়া উচিত প্রকৃত মূল্যায়নের মানদণ্ড।
প্রকল্পটির ব্যয়ও সময়ের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১৭ সালে অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকায় পৌঁছায়। সর্বশেষ দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ২৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, এক্সপ্রেসওয়ে একটি আর্থিকভাবে লাভজনক প্রকল্প হওয়ার কথা। কিন্তু প্রকল্পের উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত রেখে ব্যয় যদি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যায়, তাহলে আর্থিক লাভজনকতার সূচকগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তার মতে, প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শেষে একটি স্বাধীন পোস্ট-ইভ্যালুয়েশন বা বাস্তবায়নোত্তর মূল্যায়ন জরুরি।
অন্যদিকে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ব্যয় বৃদ্ধিকে যৌক্তিক বলে দাবি করেছে। প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, ভ্যাট-কর ও শুল্ক বৃদ্ধি, ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত না থাকা ইউটিলিটি স্থানান্তর, রেলওয়ে ও বিআইডব্লিউটিএর চাহিদা অনুযায়ী নকশা পরিবর্তন, নৌপথের শ্রেণি পরিবর্তন এবং বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মেট্রোরেল ও পাতালরেলের সঙ্গে সংযোগ যুক্ত করার কারণে ব্যয় বেড়েছে।
একই ব্যাখ্যা দিয়েছেন পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এসএম শাকিল আখতার। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে নির্মাণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানি, নতুন সংযোগপথ সংযোজন এবং বিদ্যমান ফ্লাইওভারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে অনেক স্থানে আরও উঁচু পিলার নির্মাণের প্রয়োজন হওয়ায় প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর পরও প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করেননি।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, প্রকল্পটির শুরু থেকেই পরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল। তার ভাষায়, নকশা পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয়, নির্মাণসামগ্রী আমদানি এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার নানা কারণে বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয় অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি হয়। ভবিষ্যতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কোন কোন খাতে কেন ব্যয় বাড়ছে, তা নিয়ে তুলনামূলক গবেষণা ও বিশ্লেষণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।