রাজু আলীম
টেলিভিশনের পর্দায় একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। পেছনে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। কোথাও ধানের শীষ দুলছে, কোথাও কৃষক ব্যস্ত ফসলের পরিচর্যায়। ক্যামেরার সামনে তিনি কথা বলছেন কৃষকের সঙ্গে, কখনো মাটির গুণাগুণ নিয়ে, কখনো নতুন কোনো ফসলের সম্ভাবনা নিয়ে। তাঁর প্রশ্নগুলো খুব সহজ, কিন্তু সেই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই সামনে চলে আসে একজন কৃষকের জীবনের বহু অজানা গল্প।
বাংলাদেশের টেলিভিশন দর্শকের কাছে এই দৃশ্য দীর্ঘদিনের পরিচিত। পরিচিত সেই মানুষটি শাইখ সিরাজ। কৃষি নিয়ে কথা বলা তাঁর কাছে কেবল পেশাগত দায়িত্ব নয়, বরং দীর্ঘ জীবনের এক নিবিড় সাধনা। চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি দেশের কৃষক, কৃষি ও গ্রামীণ জীবনের কথা তুলে এনেছেন গণমাধ্যমে। শহরের ঘরে বসে থাকা মানুষকে নিয়ে গেছেন গ্রামের মাঠে, কৃষকের বাড়িতে, খামারে কিংবা নদীর পাড়ে। কৃষকের সাফল্য যেমন দেখিয়েছেন, তেমনি তাঁর সংকটের কথাও বলেছেন।![]()
আজ ৭ সেপ্টেম্বর শাইখ সিরাজের জন্মদিন। ১৯৫৪ সালের এই দিনে চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন এই কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। জীবনের ৭২ বছর পূর্ণ করলেন তিনি। দীর্ঘ এই পথচলায় একজন সাংবাদিকের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও অনেক পরিচয়—কৃষি-উন্নয়নকর্মী, লেখক, অনুষ্ঠান নির্মাতা, উপস্থাপক এবং কৃষির নতুন সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করা এক নিরলস প্রচারক।
শাইখ সিরাজের গল্পের শুরু অবশ্য টেলিভিশনের পর্দা থেকে নয়। ছাত্রজীবনেই তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয় বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার ও সংবাদপত্রের সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর গণমাধ্যমের কাজকে ধীরে ধীরে নিজের জীবনের কেন্দ্র করে নেন তিনি।
তখনকার বাংলাদেশে কৃষি ছিল মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতাগুলোর একটি। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে কৃষকের জীবন বা কৃষি উৎপাদনের গল্প খুব একটা আলোচনার কেন্দ্রে আসত না। কৃষি নিয়ে আলোচনা অনেক সময় সীমাবদ্ধ থাকত উৎপাদন, সার, বীজ কিংবা আবহাওয়ার খবরের মধ্যে। কৃষকের স্বপ্ন, উদ্ভাবন, সংগ্রাম কিংবা সম্ভাবনার গল্প ছিল অনেকটাই আড়ালে।
সেই জায়গাতেই ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা শুরু করেন শাইখ সিরাজ।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কৃষিকে তিনি নিয়ে আসেন দর্শকের বসার ঘরে। গ্রামবাংলার মাটি, মানুষের জীবন ও কৃষির গল্প একসঙ্গে উঠে আসতে থাকে পর্দায়। অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তা দ্রুতই বাড়তে থাকে। কৃষকেরা যেমন নিজেদের কথা বলার একটি জায়গা পান, তেমনি শহরের দর্শকরাও কৃষির ভেতরের জীবনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান।
‘মাটি ও মানুষ’ কেবল কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান হিসেবে জনপ্রিয় হয়নি। এর সঙ্গে তৈরি হয়েছিল একটি আবেগের সম্পর্ক। কারণ এখানে কৃষক ছিলেন কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, তিনি ছিলেন একজন মানুষ। তাঁর পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে, দুশ্চিন্তা আছে, সাফল্যের আনন্দ আছে। কখনো ভালো ফলনের খুশি, কখনো বাজারদরের হতাশা—সবই জায়গা পেয়েছে অনুষ্ঠানের গল্পে।![]()
শাইখ সিরাজের কাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই। তিনি কৃষিকে শুধু কৃষি হিসেবে দেখেননি। কৃষির সঙ্গে মানুষকে মিলিয়ে দেখেছেন।
একজন কৃষক নতুন কোনো জাতের ধান চাষ করে সফল হয়েছেন—সেই গল্প তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কৃষক পতিত জমিতে নতুন ফসল ফলিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন—সেটিও তাঁর কাছে গল্প। আবার কোনো এলাকায় কৃষকরা বাজারব্যবস্থার সমস্যায় পড়েছেন কিংবা উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন—সেই সমস্যাকেও সামনে এনেছেন তিনি। ফলে তাঁর প্রতিবেদন ও অনুষ্ঠানে কৃষি কখনো নিছক প্রযুক্তিগত বিষয় হয়ে থাকেনি; তা মানুষের জীবন ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছে।
সময়ের সঙ্গে তাঁর কাজ আরও বিস্তৃত হয়েছে। চ্যানেল আইয়ের যাত্রা শুরু হওয়ার পর তিনি নির্মাণ ও উপস্থাপনা করেন ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’। নামের মধ্যেই যেন তাঁর কাজের দর্শনটি ধরা আছে। মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, কৃষকের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক, খাদ্যের সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্ক—সবকিছু তিনি সহজ ভাষায় দর্শকের সামনে হাজির করেছেন।
বাংলাদেশের কৃষিতে গত কয়েক দশকে যে পরিবর্তন এসেছে, তার গল্পও তাঁর অনুষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে। কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে, নতুন জাতের ফসল এসেছে, কৃষক বৈচিত্র্যময় পণ্যের দিকে গেছেন, মাছ ও গবাদিপশু পালন নতুনভাবে বিস্তৃত হয়েছে। অনেক তরুণ কৃষিকে পুরোনো পেশা হিসেবে না দেখে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। এসব পরিবর্তনের পেছনে বহু ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও নীতির অবদান রয়েছে। তবে সেই পরিবর্তনকে মানুষের সামনে দৃশ্যমান করে তোলার ক্ষেত্রে শাইখ সিরাজের সাংবাদিকতার ভূমিকা আলাদা করে আলোচিত হয়।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জননীতি বিশ্লেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য একসময় শাইখ সিরাজের কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে কৃষির বহুমুখীকরণ, অপ্রচলিত কৃষিপণ্যের জনপ্রিয়তা, যান্ত্রিকীকরণ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মতো বিষয় সামনে আনেন। তাঁর মতে, কৃষির সম্ভাবনাকে নতুনভাবে জাতির সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি শাইখ সিরাজ তরুণদের আধুনিক কৃষিতে যুক্ত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন। কৃষকের সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নটিও তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এই কথার সঙ্গে শাইখ সিরাজের কাজের অনেকটাই যেন মিলে যায়। কারণ তাঁর অনুষ্ঠানে কৃষককে কখনো সবার মতো করে দেখা হয়নি। বরং তাঁদেরকে দেখা হয়েছে উৎপাদনশীল মানুষ, উদ্যোক্তা এবং দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই হয়তো তাঁর সাংবাদিকতাকে আলাদা করে দিয়েছে।
কৃষির সঙ্গে গ্রামবাংলার সংস্কৃতির সম্পর্কও তাঁর কাজের বড় অংশ। খেতের পাশে বসে কৃষকের গল্প শোনা, গ্রামের মেলা, স্থানীয় খাবার, ঐতিহ্যবাহী পেশা কিংবা মানুষের জীবনযাপনের নানা অনুষঙ্গ তাঁর কাজের মধ্যে বারবার এসেছে। কৃষি যে কেবল জমি ও ফসলের হিসাব নয়, বরং একটি সমাজের জীবনযাত্রার অংশ—তাঁর কাজ সেই সত্যটিকে সামনে এনেছে।![]()
শাইখ সিরাজের কাজের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু লেখক ইমদাদুল হক মিলনের মূল্যায়নও এমনই। তাঁর মতে, শাইখ সিরাজ অত্যন্ত কর্মঠ একজন মানুষ, যাঁর ধ্যান-জ্ঞান-প্রেম বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষককে ঘিরে। কৃষির উন্নতি কীভাবে সম্ভব, কৃষকের জীবন কীভাবে বদলাতে পারে—এসব ভাবনা তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।
এই নিরন্তর ছুটে চলার স্বীকৃতিও এসেছে দেশে-বিদেশে। উন্নয়ন সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি ১৯৯৫ সালে একুশে পদক এবং ২০১৮ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় দুই বেসামরিক সম্মান পাওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর কাজের ব্যাপ্তির একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তাঁর কাজ পেয়েছে সম্মান। খাদ্যনিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচনে সাংবাদিকতার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এ এইচ বুর্মা অ্যাওয়ার্ড পান তিনি। পেয়েছেন গুসি পিস প্রাইজ ও ব্রিটেনের বিসিএ গোল্ডেন জুবিলি অনার অ্যাওয়ার্ডস। ব্রিটিশ হাউস অব কমনস তাঁকে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে। ব্রিটিশ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সংগঠন দিয়েছে গ্রিন অ্যাওয়ার্ড। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির স্বর্ণপদক, ডা. ইব্রাহিম মেমোরিয়াল স্বর্ণপদক, রণদা প্রসাদ সাহা স্বর্ণপদকসহ অর্ধশতাধিক দেশি-বিদেশি পুরস্কার ও সম্মাননাও পেয়েছেন তিনি।
তবে পুরস্কারের তালিকার চেয়ে তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো অন্য জায়গায়।
একজন শহুরে দর্শক যখন টেলিভিশনের পর্দায় কোনো কৃষককে নতুন পদ্ধতিতে চাষ করতে দেখেন, তখন তিনি শুধু একটি ফসলের গল্প দেখেন না। তিনি দেখতে পান সম্ভাবনার একটি ছবি। একজন তরুণ যখন দেখে অন্য একজন তরুণ কৃষিকাজ করে সফল হয়েছেন, তখন কৃষি সম্পর্কে তার ধারণাটিও বদলাতে পারে। আর একজন কৃষক যখন নিজের মতো আরেকজন মানুষের সাফল্য দেখতে পান, তখন তাঁর মধ্যেও নতুন কিছু করার সাহস জন্মাতে পারে।
শাইখ সিরাজের সাংবাদিকতা এই জায়গাটিতেই এসে সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
তিনি কৃষকের কাছে গেছেন, কৃষকের কথা শুনেছেন এবং সেই কথা আবার ফিরিয়ে দিয়েছেন দেশের মানুষের কাছে। ফলে যোগাযোগটি হয়েছে দুই দিক থেকে। কৃষক যেমন তাঁর সমস্যার কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন, তেমনি শহরের মানুষও বুঝতে পেরেছেন তাদের খাবারের পেছনে থাকা মানুষগুলোর জীবন কতটা কঠিন, আবার কতটা সম্ভাবনাময়।
টেলিভিশনের বাইরে লেখালেখিতেও কৃষি ও উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের তালিকায় রয়েছে ‘মৎস্য ম্যানুয়েল’, ‘মাটি ও মানুষের চাষবাস’, ‘ফার্মার্স ফাইল’, ‘মাটির কাছে মানুষের কাছে’, ‘বাংলাদেশের কৃষি: প্রেক্ষাপট ২০০৮’, ‘কৃষি ও গণমাধ্যম’, ‘কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট’, ‘আমার স্বপ্নের কৃষি’, ‘সমকালীন কৃষি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ এবং ‘কৃষি ও উন্নয়নচিন্তা’। বইগুলোর বিষয়বস্তুতে যেমন কৃষির বাস্তবতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে কৃষকের জীবন, উন্নয়ন ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
বর্তমানে তিনি ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আইয়ের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং বার্তাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। টেলিভিশনে কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান নির্মাণ ও উপস্থাপনার পাশাপাশি গণমাধ্যমে লিখছেন কৃষি ও উন্নয়ন নিয়ে।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ শাইখ সিরাজের বয়স ৭৩। তাঁর পরিচয়ের কেন্দ্রে এখনো সেই মাটি, সেই মানুষ, সেই কৃষক। বাংলাদেশের কৃষি বদলেছে, কৃষির প্রযুক্তি বদলেছে, কৃষকের উৎপাদন পদ্ধতিতে এসেছে পরিবর্তন। গণমাধ্যমও বদলে গেছে। টেলিভিশনের পাশাপাশি এসেছে ডিজিটাল মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নানা নতুন প্ল্যাটফর্ম।
কিন্তু কৃষকের গল্প বলার প্রয়োজন শেষ হয়নি।
বরং কৃষির সঙ্গে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনযাত্রার সম্পর্ক যত স্পষ্ট হচ্ছে, কৃষকের গল্পও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সেই গল্পকে মানুষের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার যে ঐতিহ্য শাইখ সিরাজ তৈরি করেছেন, সেটিই তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের বড় পরিচয়।
মাটি থেকে উঠে আসা মানুষের গল্প তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন মানুষের কাছেই। তাই শাইখ সিরাজের জন্মদিন শুধু একজন সাংবাদিকের জন্মদিন নয়; এটি কৃষক ও কৃষিকে ঘিরে দীর্ঘ এক গণমাধ্যমযাত্রারও স্মরণীয় দিন।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
![]()