সমাজের সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে একটু একটু করে এগিয়ে এলে বড় অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে বেসরকারি খাতকে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেছেন, যারা মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চান, সরকার সব সময় তাদের পাশে থাকবে।
মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সিলেট বিভাগের চা-বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে ২০ হাজার রেইনকোট বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে চা-শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার তহবিলের সহায়তায় এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব শাহরিয়ার পামির জানান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এ কর্মসূচির আওতায় সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের চা-শ্রমিকদের মধ্যে ২০ হাজার রেইনকোট বিতরণ করা হবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ ১০ হাজার, শেভরন বাংলাদেশ ৫ হাজার এবং পাণ্ডুঘর গ্রুপ ৫ হাজার রেইনকোট সরবরাহ করছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনকল্যাণমূলক কাজ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে এগিয়ে এলে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া ও শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা বলেন, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সমাজের পিছিয়ে পড়া ও শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাদের দায়িত্ব। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ভবিষ্যতেও বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে তাঁরা কাজ করে যেতে চান।
চা-শ্রমিকদের জন্য নেওয়া এ উদ্যোগকে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সিলেট বিভাগের চা-বাগানগুলোতে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। বৃষ্টির সময় তাঁদের কর্মপরিবেশ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় রেইনকোট বিতরণ শ্রমিকদের দৈনন্দিন কাজে কিছুটা সুরক্ষা দেবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অনুষ্ঠানে শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া সিলেট-৬, মৌলভীবাজার-১, মৌলভীবাজার-৩ ও হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্যরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের মধ্যে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেক হোসেন, উপদেষ্টা তপন চৌধুরী, কার্যনির্বাহী সদস্য ও ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান, নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম, শেভরন বাংলাদেশের পরিচালক মো. ইমরুল কবির, শেহজাদ রহমান, হেড অব কমিউনিটি এনগেজমেন্ট এ কে এম আরিফ আখতার এবং পাণ্ডুঘর গ্রুপের পিপল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স চিফ গোলাম হাবিব উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত রাজস্ব সম্মেলন ২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা, বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।’ ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সাফল্য অনেকাংশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, দেশের জনগণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়। বিশেষ করে করদাতারা চান, এনবিআর তাঁদের আস্থার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করুক।
দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। নীতি ও নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে কাউকে পৃষ্ঠপোষকতা, কারও প্রতি বিরূপ আচরণ এবং রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান বলেন, এখন সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও জনবান্ধব করে গড়ে তোলার সময় এসেছে। তাঁর ভাষায়, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।
বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরন বদলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কর ও রাজস্ব ব্যবস্থায়ও নতুন নতুন মডেল ও ব্যবস্থাপনা চালু হচ্ছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত সমস্যা, সম্ভাবনা, সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন এখন সময়ের দাবি।
কর ব্যবস্থাপনা ও কর আদায়ের পদ্ধতি সহজ, স্বচ্ছ এবং দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত করার ওপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, করদাতারা যাতে স্বেচ্ছায় কর দিতে আগ্রহী হন এবং কর দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
একই করদাতার ওপর বারবার করের বোঝা না বাড়িয়ে কর প্রদানে সক্ষম ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে যথাযথভাবে শনাক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে করের আওতা বাড়িয়ে নতুন করদাতা শনাক্ত করা এবং রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক ও টেকসই করতে ডিজিটাল এবং তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসনের কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে কর ব্যবস্থাপনাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে করদাতা ও সরকারের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়।
রাজস্ব সম্মেলন ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হয়। সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আনোয়ার চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন। সম্মেলনে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, কর প্রশাসনের সংস্কার এবং অর্থনীতির পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা হয়।
একদিকে চা-শ্রমিকদের মতো শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগ, অন্যদিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করার পরিকল্পনা—দুই আয়োজনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে উঠে এসেছে একই বার্তা। রাষ্ট্রের বড় সমস্যাগুলো সমাধানে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে দায়িত্বশীল অংশগ্রহণই পারে পরিবর্তনের গতি বাড়াতে।![]()