শেলী নাজ
একাকিনী মায়ের একমাত্র রাজকন্যার মাত্র ৩৪৬ টাকা কাবিনে বিয়ে হয়ে গেল, সেদিন বিয়ে প্রায় ভেঙ্গে যায় অবস্থা, আমার মা, ভাই বোন কেউ রাজি হচ্ছিল না। আমার নারীবাদী সত্ত্বার ভেতরে সনাতনী এক মা হঠাৎ করে বেঁকে বসল, মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে বুকে সকাল থেকে ব্যথা শুরু হলো। সন্ধ্যায় কাবিন, সকল আয়োজন, সাজসজ্জা সম্পন্ন আর দুপুর দুইটা পর্যন্ত আমি কোরান, হাদিস, শরীয়াহ আইন, জজসাহেব, লইয়ার কনসালটেশন- এইসব করছি, এ বিয়ে হবে না বলে আমার ভাই থেকে থেকে হুঙ্কার দিচ্ছে! কিন্তু আমার মেয়ে আমার চেয়েও বাঁকা, সে এর চেয়ে বেশি কাবিনের টাকা নির্ধারণে রাজি না। ৩৪৬ সংখ্যাটা আমাদের জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত! এটা নদীর ক্যাডেট নম্বর। কোনো একটা টাকার অংক লিখতে হবে বলে এ সংখ্যাটা লিখতে হয়েছে। সন্ধ্যা নাগাদ আমি হার মানলাম। বিয়ে হলো। বিয়ের পড়ানোর মাঝখানেও একটু ঝামেলা হলো কাজী সাহেব মায়ের নাম না বলায়। আমার মেয়ে বলল, ‘তুমি ফেইক নারীবাদী, বিশেষ বিশেষ সময় তুমি নিজেই টিপিক্যাল বাঙালী মা হয়ে যাও! আমি কোনো পণ্য না যে কাবিনে আমার মূল্য নির্ধারণ করতে হবে!’ হয়তো আমার গর্ব করা উচিত এই ভেবে যে আমার কন্যা প্রচলিত একটা প্রথা ভাঙতে চেয়েছে! নারীর স্বাধীন শরীর ও সত্ত্বা ক্রয়যোগ্য নয়, এর কোনো বিনিময়মূল্য নেই, শুধু ভালোবাসার মোহর দিয়েই একে পাওয়া যায়! নদী বলল, ওর কাবিনের দিনে এইসব ঝামেলা করার জন্য আমাকে কখনও ক্ষমা করবে না! না করুক, তবু সে সুখি হোক, যেভাবে সে সুখি হতে চায় সেভাবেই। নদীর আত্মপ্রত্যয় ও শক্ত মেরুদণ্ডকে আমি কুর্ণিশ করি।![]()
নদীর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে তিন মাস হয়ে গেল। ভাবি আমাদের অন্তহীন দুঃখের সাগা শেষ হলো বুঝি! কিন্তু জানি না কেন কয়েকদিন ধরে বুকে চিনচিন ব্যথা করছে! নদী একদিন বলেছিল, ‘তুমি আমার জীবনের একটা ফেইজ মিস করছো, দেখো নাই’। আজকাল মধ্যরাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়, বহুদূর থেকে জীবনের শতখণ্ড আখ্যানের মধ্যে গুমরে ওঠা দুয়েকটি মুহূর্ত তীরবেগে ছুটে এসে আমার চোখ অন্ধ করে দেয়, আমি ঘুমুতে পারি না! যদিও অন্ধ চোখের কান্না করতে কোনো বাধা নেই, কিন্তু আমি কাঁদতেও পারি না। মনে পড়ে সে দিনটির কথা যেদিন ক্যাডেট কলেজের পাঠ চুকিয়ে ঢাকায় ফিরে এসেছিল সে, এত বড় নির্মম ঢকা শহরে মায়ের মতো কোনো চাঁদ তার ছিল না! এত এত বছর পর মধ্যরাতে ঘুম ভেঙ্গে এসব মনে পড়ে। ঢাকায় বেইলি রোডে আমার পাশের বাসার ভদ্রলোকের দুই সন্তান ক্যাডেট কলেজের পড়া শেষে যেদিন ফিরেছিল সেদিন উনারা বাচ্চাদের জন্য ঘর সাজিয়েছিলেন, দরজায় জরির কাগজ দিয়ে লেখা ছিল ‘ওয়েলকাম হোম’। ভেবেছিলাম আমিও ওরকম ‘ওয়েলকাম হোম’ লিখে দরজায় টাঙ্গিয়ে রাখব! কিন্তু তার আগেই নিয়তি আমাকে ছুড়ে ফেলল বহুদূরে! কন্যা ফিরে আসার গর্বে আমার ঘর আর সেজে উঠল না। সেদিনও হয়ত নদী মনে মনে বলেছিল, ‘ তোমার ক্ষমা নাই, আম্মু’।
অক্ষমার্হ আমি, ভালোবাসা প্রকাশে চিরঅক্ষম আমি আজ খুশি! পিতৃতন্ত্রের কাঠগড়ায় ব্যর্থ মা হিসেবে আমাকে যারা দাড় করিয়ে দিয়েছে আমি তাদের দিনশেষে ক্ষমা করে দিই অথবা না দিই, যা আমি হারিয়েছি তা আর পাব না কোনোদিন, আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে গেছে সোনার মুহূর্ত অনাদরে, তবু আজ কোনো খেদ নেই। নদী এবার ‘ আনবাড়ি’ যাবে আমারই আঙ্গিনা দিয়ে। নদীর আর মায়ের ঘরে ফেরা হলো না। কিম্তু কোনো এক অলৌকিক মন্ত্রবলে সে তার নিজের কাছে ফেরার একটা ঘর পেয়েছে, যে ঘর যত্নে সাজানোর জন্য একজন সঙ্গী পেয়েছে।
নদী ও আকাশের যুগলজীবন কাঁটার পৃথিবীতে স্বর্গ রচনা করুক, জন্মদিনে এই প্রার্থনা করি।
![]()