তন্ময় মাহমুদ
নিউইয়র্কে এখন বাংলাদেশের মানুষের আনাগোনা একটু বেশি। জাতিসংঘের সদর দপ্তরের করিডোরে, অধিবেশনকক্ষের আলোচনায়, কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে কিংবা কোনো উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানের মঞ্চে—কোথাও না কোথাও বাংলাদেশি পরিচয়টি সামনে আসছে। বিষয়টি নিছক উপস্থিতির নয়। এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের কয়েকজন মানুষ এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতার একটি ভিন্ন ছবি তুলে ধরছে।
একদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব তিনি পালন করছেন। জাতিসংঘের ভাষায়, সাধারণ পরিষদ হচ্ছে সংস্থাটির প্রধান deliberative, policymaking and representative organ। সেই পরিষদের এক বছরের নেতৃত্বে একজন বাংলাদেশি—এ ঘটনা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যের।![]()
এখানেই শেষ নয়। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বাংলাদেশের রাবাব ফাতিমা। তিনি আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল এবং স্বল্পোন্নত দেশ, ভূ-বেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জুলাইয়ে তাঁকে আফগানিস্তানবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি এবং আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা মিশন UNAMA-এর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জাতিসংঘের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম জটিল রাজনৈতিক সংকটের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের একজন কূটনীতিক এখন জাতিসংঘের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
আরেকদিকে, জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন আইরিন খান। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর এই দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বে নতুন একটি মাত্রা যোগ করেছে। মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক নীতি নিয়ে যাঁর দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁর হাতে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের নেতৃত্বও কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
এর সঙ্গে যদি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিটিও যোগ করি, তাহলে এবারের ছবিটি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি রাষ্ট্রীয় কোনো পদে জাতিসংঘে যাননি। তাঁর পরিচয় অন্য জায়গায়—নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃৎ এবং সামাজিক ব্যবসার ধারণার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবে। বহু বছর ধরে জাতিসংঘের বিভিন্ন উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক নীতিচিন্তার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পাশের উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানেও সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর বক্তব্য সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।![]()
একজন বাংলাদেশি সাধারণ পরিষদের সভাপতি। একজন বাংলাদেশি জাতিসংঘের আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল। একজন আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মী বাংলাদেশি পরিচয়ে জাতিসংঘে দেশের স্থায়ী প্রতিনিধি। আর একজন বাংলাদেশি নোবেলজয়ী বিশ্বমঞ্চে সামাজিক ব্যবসা ও তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার কথা বলছেন। চারজনের কাজের ক্ষেত্র আলাদা। তাঁদের দায়িত্বের ধরনও আলাদা। কিন্তু চারটি উপস্থিতি মিলে যে ছবিটি তৈরি হয়, সেটিই এবারের জাতিসংঘে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গল্প।
আমরা সাধারণত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাফল্য বলতে কোনো একটি চুক্তি, কোনো একটি পদ বা কোনো একটি বক্তৃতাকে বুঝি। অথচ একটি দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান তৈরি হয় ধীরে ধীরে। সেখানে রাষ্ট্রের কূটনীতি যেমন থাকে, তেমনি থাকে সেই দেশের মানুষের পেশাগত দক্ষতা, চিন্তা, নেতৃত্ব এবং বিশ্বপরিসরে কাজ করার সামর্থ্য। নিউইয়র্কে এবারের বাংলাদেশি উপস্থিতির বিশেষত্ব এখানেই।
ড. খলিলুর রহমানের দায়িত্বের দিকে তাকালে রাষ্ট্রীয় কূটনীতির জায়গাটি স্পষ্ট হয়। সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাঁকে শুধু একটি অধিবেশন পরিচালনা করতে হচ্ছে না; বিভিন্ন রাষ্ট্রের মতপার্থক্যের মধ্যেও আলোচনা এগিয়ে নেওয়া, ঐকমত্যের জায়গা খুঁজে বের করা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ধরে রাখার কাজও করতে হচ্ছে। তাঁর সভাপতিত্বের মূল প্রতিপাদ্য—‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’—এই সময়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় প্রশ্নগুলোর সঙ্গেই সম্পর্কিত।
রাবাব ফাতিমার দায়িত্ব আবার অন্য ধরনের। বিশ্বের স্বল্পোন্নত, ভূ-বেষ্টিত উন্নয়নশীল ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ নিয়ে জাতিসংঘের কাঠামোয় কাজ করা মানে উন্নয়ন, জলবায়ু, অর্থায়ন ও বৈশ্বিক বৈষম্যের মতো প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা। আফগানিস্তানে জাতিসংঘ মিশনের প্রধান হিসেবে তাঁর নতুন দায়িত্ব সেই পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। তিন দশকের বেশি সময়ের কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে একজন বাংলাদেশি নারী এখন এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রয়েছেন—এটিও কম গর্বের বিষয় নয়।
আইরিন খানের উপস্থিতি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের আরেকটি দিক সামনে আনে। বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর দায়িত্বের মূল জায়গা রাষ্ট্রীয় কূটনীতি হলেও তাঁর পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা জড়িয়ে আছে। ফলে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের পরিসরও একটি বিস্তৃত অভিজ্ঞতা পাচ্ছে।

আর ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিচয়টি এসেছে অন্য একটি পথ ধরে। একটি ধারণা কীভাবে একটি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে, সামাজিক ব্যবসার ধারণা তার বড় উদাহরণ। এবারের জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্যেও সেই চিন্তার প্রতিফলন ছিল। অর্থ উপার্জনের বাইরে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার আনন্দ, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন নিঃসরণমুক্ত ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’—এই ধারণাগুলো তিনি দীর্ঘদিন ধরে সামনে রেখে আসছেন।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে। বাংলাদেশের এই চারটি উপস্থিতি একই ধরনের নয়। কেউ সরকারের প্রতিনিধি, কেউ জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তা, কেউ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনের পরিচিত মুখ, কেউ আবার বৈশ্বিক উন্নয়নচিন্তার একজন প্রবক্তা। ফলে তাঁদের সাফল্যকে একই মাপকাঠিতে মাপারও সুযোগ নেই। কিন্তু তাঁদের উপস্থিতি একসঙ্গে বাংলাদেশের জন্য যে দৃশ্যমানতা তৈরি করেছে, তার গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।
আর এই দৃশ্যমানতার সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো, এটি শুধু নিউইয়র্কে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক দশকের শ্রম, শিক্ষা, কূটনীতি, পেশাগত দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সক্ষমতা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নতুন কিছু নয়। ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হয়েছিলেন। প্রায় চার দশক পর আবার একজন বাংলাদেশি সেই আসনে। সময় বদলেছে, পৃথিবী বদলেছে, জাতিসংঘের সামনে সংকটের ধরন বদলেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের উপস্থিতির আকাঙ্ক্ষাটি একই আছে। এবার সেই উপস্থিতি যেন আরও কয়েকটি স্তরে একসঙ্গে দৃশ্যমান।
আজকের বাংলাদেশকে শুধু উন্নয়ন, জনসংখ্যা বা অর্থনীতির পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যায় না। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কী করছেন, সেটিও দেশের নতুন পরিচয়ের অংশ। নিউইয়র্কের এই দৃশ্যপট সেই পরিবর্তনের কথাই বলে।
একসময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচয় উচ্চারিত হতো মূলত জলবায়ু ঝুঁকি, দারিদ্র্য, দুর্যোগ কিংবা উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জের প্রসঙ্গে। এখন সেই আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষ নেতৃত্বের জায়গাতেও রয়েছেন। কেউ বৈশ্বিক নীতির টেবিলে, কেউ কূটনীতির কেন্দ্রে, কেউ মানবাধিকারের আলোচনায়, কেউ সামাজিক ব্যবসা ও নতুন অর্থনৈতিক চিন্তার মঞ্চে।
এ কারণেই এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের জন্য একটু আলাদা। এখানে শুধু বাংলাদেশের পতাকা নেই, আছে বাংলাদেশিদের দৃশ্যমান নেতৃত্বও।
নিউইয়র্কের আকাশে জাতিসংঘের পতাকার পাশে বাংলাদেশের পতাকা বহুদিন ধরেই উড়ছে। এবারের বিশেষত্ব হলো, সেই পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের কয়েকজন বিশ্বপরিসরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের পথ আলাদা, গল্প আলাদা। কিন্তু তাঁদের সাফল্যের ভেতর দিয়ে একটি কথাই বারবার সামনে আসে—বাংলাদেশের মানুষ এখন বিশ্বের বড় মঞ্চে শুধু দর্শক নন, অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা আলোচনার অংশ, সিদ্ধান্তের অংশ, নেতৃত্বের অংশ।
এটাই এবারের জাতিসংঘে বাংলাদেশিদের জয়জয়কারের সবচেয়ে বড় অর্থ।![]()