লাল জ্যাকেট, পরিপাটি সাজ, প্রাণবন্ত উপস্থিতি—বয়সের হিসাবকে যেন নিজের চিন্তা ও চলনে খুব একটা গুরুত্ব দেন না আহসান উল্লাহ মনি। চলচ্চিত্রের মানুষ হিসেবে নিজেকে সবসময় আলাদা করে উপস্থাপন করার একটা চেষ্টা তাঁর মধ্যে এখনও স্পষ্ট। বহু দশক ধরে সিনেমা নির্মাণ, প্রদর্শন, ব্যবসা, পর্যটন ও নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত এই মানুষটির কাছে জীবন যেন একই সঙ্গে অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা ও নতুন কিছু করার ধারাবাহিক গল্প।
সাক্ষাতে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বসলে বোঝা যায়, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এলেও কাজের প্রতি আগ্রহে ভাটা পড়েনি। বরং নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন প্রজন্ম, চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা দেশের উন্নয়ন—সবকিছু নিয়েই এখনও তাঁর নিজস্ব কিছু ভাবনা আছে। নিজের উপস্থিতি সম্পর্কেও তাঁর ব্যাখ্যা সরল। তাঁর ভাষায়, “আমি সিনেমা জগতের মানুষ। সবসময়ে গ্ল্যামার নিয়ে কাজ করেছি। নিজেকেও তাই সবসময় কালারফুল, ব্রাইট রাখার চেষ্টা করি। নিজের কাছেও ভালো লাগে এই ব্যাপারটা।”
চলচ্চিত্রের সঙ্গে আহসান উল্লাহ মনির সম্পর্ক শুরু হয়েছিল খুব অল্প বয়সেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৬৭ সাল থেকেই তিনি চলচ্চিত্র অঙ্গণের সঙ্গে যুক্ত। পারিবারিক পরিবেশও তাঁকে এই জগতে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। তাঁর ভগ্নিপতি ছিলেন চলচ্চিত্র প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তাঁকে কাছ থেকে দেখেই চলচ্চিত্র নির্মাণ ও ব্যবসার নানা দিক শেখার সুযোগ পান তিনি। সে সময় সদ্য ম্যাট্রিক পাস করে জগন্নাথ কলেজে পড়ছিলেন। একদিকে উত্তাল রাজনৈতিক সময়, অন্যদিকে চলচ্চিত্রের জগত—দুটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা তাঁর তরুণ বয়সের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
সেই সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের কথাও স্মরণ করেন তিনি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানেও অংশ নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। পরে মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও বলেন। রাজনীতি তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হলেও সক্রিয় রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে থাকার পথ বেছে নেননি। তাঁর ভাষায়, “আমি চাইলে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশ নিয়ে মন্ত্রী-এমপি হতে পারতাম। কিন্তু তা করিনি।”
ব্যবসা তাঁর কাছে কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম ছিল না—নিজের পছন্দ ও আগ্রহের সঙ্গে মিল রেখে কাজ করার একটি ক্ষেত্রও ছিল। তিনি জানান, ইচ্ছা করলে কলকারখানা, গার্মেন্টসহ নানা খাতে ব্যবসা করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর পছন্দ ছিল এমন কিছু করা, যেখানে বিনোদন, পর্যটন ও মানুষের প্রয়োজন—সবকিছুর সমন্বয় থাকে। চলচ্চিত্র নির্মাণ ও সিনেমা হল ব্যবসার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে হোটেল ব্যবসায়ও যুক্ত হন তিনি।
চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা আরও বিস্তৃত। ঢাকায় রাজমণি ও রাজিয়া প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠার আগে দেশের বিভিন্ন জেলাতেও তাঁর একাধিক সিনেমা হল ছিল বলে জানান তিনি। নরসিংদী, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় চলচ্চিত্র প্রদর্শন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে একসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সিনেমা হলের সংখ্যা ১ হাজার ৫০০ পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলেও দাবি করেন তিনি। সেই সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে নির্মাণ ও প্রদর্শন—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের কর্মচাঞ্চল্য ছিল।
কাকরাইলের রাজমণি ও রাজিয়া ছিল সেই সময়ের আলোচিত প্রেক্ষাগৃহগুলোর মধ্যে। দর্শকের ভিড়, নতুন সিনেমা নিয়ে উচ্ছ্বাস আর শো-ভিত্তিক ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে সিনেমা হল ছিল নাগরিক বিনোদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। আহসান উল্লাহ মনি মনে করেন, সিনেমা শিল্পের সেই জৌলুস ফিরিয়ে আনতে হলে দর্শকের রুচি ও চাহিদার দিকে নতুন করে তাকাতে হবে।
চলচ্চিত্রের বর্তমান সংকট নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণও বেশ সরাসরি। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সিনেমার ভাষা ও নির্মাণের ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ডিজিটাল ক্যামেরায় নির্মিত অনেক সিনেমা মোবাইল ফোন কিংবা টেলিভিশন পর্দায় দেখার উপযোগী হলেও বড় পর্দার জন্য যে ধরনের ভিজ্যুয়াল আবেদন প্রয়োজন, তার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। তাঁর মতে, শুধু ক্যামেরা বদলালেই সিনেমা হয় না; নির্মাতাকে দর্শককে বুঝতে হবে, পড়াশোনা করতে হবে এবং সমাজ ও মানুষের রুচি সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে।
“সিনেমা হলো একই সঙ্গে শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক একটি মাধ্যম। যিনি সিনেমা নির্মাণ করবেন তাকে একজন শিক্ষকের মতো হতে হবে। অনেক কিছু জানতে হবে। পড়াশোনা করে আসতে হবে। দর্শক পর্দায় কী দেখতে চায়—সে সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে পুরোপুরিভাবে,” বলেন তিনি।
চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যাননি তিনি। বরং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে নিজের ফিল্ম স্টুডিও রয়েছে বলে জানান। সেখানে শুটিং ফ্লোর, ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জামসহ চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। কয়েক বছর আগে নিজের প্রযোজনায় একসঙ্গে ২৫টি সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা দেওয়ার কথাও জানান তিনি। সর্বশেষ ‘ক্ষুদিরামের ফাঁসি’ নামে একটি সিনেমা নির্মাণের কথা উল্লেখ করে বলেন, ছবিটি ইউটিউবে দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি পর্যটন ব্যবসাও তাঁর বর্তমান কর্মকাণ্ডের বড় অংশ। কাকরাইলে রাজমণি ঈশা খাঁ হোটেল পরিচালনা করছেন দীর্ঘদিন ধরে। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক মানের সেবা তুলনামূলক কম খরচে দেওয়ার কারণে দেশি-বিদেশি অতিথিদের কাছে এই হোটেলের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তবে করোনা মহামারির পর বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা কমে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
একই সঙ্গে পুরোনো সিনেমা হলের জায়গায় নতুন একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে বলে জানান আহসান উল্লাহ মনি। ‘গিটার’ নামের সেই প্রকল্পে হোটেল, মার্কেট ও সিনেপ্লেক্স থাকবে। তাঁর পরিকল্পনায়, সিনেপ্লেক্সে নিজের প্রযোজিত ও পরিচালিত চলচ্চিত্রও প্রদর্শিত হবে। এর বাইরে নিজ এলাকায় ‘হারিকেন’ নামে আরও একটি আন্তর্জাতিক মানের হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। পর্যটন ও বিনোদন—দুই খাতেই এসব উদ্যোগ ভূমিকা রাখবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
আহসান উল্লাহ মনির জীবনের আরেকটি বহুল আলোচিত উদ্যোগ সোনারগাঁওয়ের মিনি তাজমহল। সম্রাট শাহজাহানের তাজমহলের আদলে নির্মিত এই স্থাপনাকে তিনি শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবে দেখেন না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর ব্যক্তিগত আবেগও। নিজের জীবনসঙ্গিনীর প্রতি ভালোবাসার কথা উল্লেখ করে বলেন, মৃত্যুর পর দুজনের কবর সেখানে করার জন্যই জায়গাটি নির্ধারণ করে রেখেছেন।
“আমার জীবনসঙ্গিনীর প্রতি ভালোবাসা, প্রেম তো রয়েছেই। এটা তো চিরন্তন ব্যাপার। তাজমহলটি নির্মাণ করেছি মৃত্যুর পর আমাদের কবরটা যেন সেখানে হয়। সে জন্য জায়গা নির্ধারণ করে রেখেছি,” বলেন তিনি।
নিজের সাফল্যের পেছনে কাকে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা মনে করেন—এ প্রশ্নে তিনি আবারও ফিরে যান পরিবারের কাছে। বড় বোনের স্বামী, যিনি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন, তাঁকেই ছোটবেলা থেকে নিজের অন্যতম আদর্শ হিসেবে দেখেছেন বলে জানান। তাঁর কাছ থেকেই ব্যবসার নানা দিক শেখার সুযোগ পেয়েছেন। তবে নিজের সাফল্যকে তিনি কেবল ব্যক্তিগত যোগ্যতার ফল হিসেবে দেখেন না। তাঁর বিশ্বাস, প্রত্যেক মানুষকে সৃষ্টিকর্তা নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য পৃথিবীতে পাঠান। তিনি নিজেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করেন এবং সেই ক্ষেত্রেই নিজের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়েছেন।
নতুন প্রজন্ম নিয়েও তাঁর প্রত্যাশা অনেক। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের তরুণদের আরও দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও বাস্তবমুখী হতে হবে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে হবে। বিদেশে গিয়ে কম মজুরির অদক্ষ কাজ করার বদলে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।
তরুণদের জন্য তাঁর একটি আলাদা প্রস্তাবও আছে। এইচএসসি পর্যায়ে ছেলে-মেয়ে সবার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের কথা বলেন তিনি। তাঁর ব্যাখ্যা, এটি যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়; বরং শৃঙ্খলা, বাস্তব জীবন ও দায়িত্ববোধ শেখার একটি উপায় হতে পারে। নিজের তরুণ বয়সের অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করেন তিনি।
নিজের পরবর্তী প্রজন্ম নিয়েও তাঁর ভাবনা স্পষ্ট। দুই সন্তানের কথা উল্লেখ করে জানান, তারা বিদেশে পড়াশোনা করেছে এবং ছেলে এখন ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। নাতিকেও ভবিষ্যতে প্রস্তুত করার কথা বলেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, একটি ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই যথেষ্ট নয়; পরবর্তী প্রজন্মকে সেটি পরিচালনা করার যোগ্য করে তুলতে হয়।
দীর্ঘ কর্মজীবনের দিকে ফিরে তাকালে আহসান উল্লাহ মনির গল্পে একসঙ্গে মিশে আছে চলচ্চিত্র, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, ব্যবসা, পর্যটন ও ব্যক্তিগত রুচির বহু স্তর। তিনি নিজেও মনে করেন, যে কাজই করেছেন, নিজের অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্যকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। আর সেই কারণেই বয়স বাড়লেও থেমে থাকার কথা ভাবছেন না।
তাঁর নিজের ভাষায়, “আমি এখনও চুপচাপ বসে নেই।” কথাটিই যেন তাঁর দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পরিচয়। সিনেমার পর্দার আলো থেকে ব্যবসার বাস্তব জগৎ—সবখানেই নিজের মতো করে একটি পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা করেছেন তিনি। বয়স তাঁর কাছে কেবল একটি সংখ্যা; কাজের আগ্রহ, নতুন কিছু করার ইচ্ছা আর নিজের জীবনকে নিজের পছন্দমতো সাজিয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাই এখনও তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।