এককভাবে দেশের ‘নাম্বার ওয়ান’ বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া আমাদের মূল লক্ষ্য
অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী
উপাচার্য, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ঐতিহ্য, অবকাঠামো, শিক্ষার্থীসংখ্যা ও একাডেমিক পরিসরের দিক থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান এখনো শক্তিশালী। তবে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় শুধু ঐতিহ্য বা আকার দিয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শিল্প খাতের সঙ্গে সংযোগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মদক্ষতা—সবকিছু মিলিয়েই এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নির্ধারিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ) নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। শুধু দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হিসেবে অবস্থান ধরে রাখা নয়, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে নিজেদের অবস্থান উন্নত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার একটি আলাদা মানদণ্ড তৈরি করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরীর মতে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা শুধু র্যাংকিংয়ের অবস্থান নিয়ে হওয়া উচিত নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণার পরিধি, শিল্প খাতের প্রয়োজনের সঙ্গে একাডেমিক শিক্ষার সামঞ্জস্য এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার সক্ষমতা। তাঁর ভাষায়, এনএসইউর লক্ষ্য কোনো যৌথ অবস্থানে সন্তুষ্ট থাকা নয়; বরং স্পষ্ট ব্যবধানে এককভাবে দেশের ‘নাম্বার ওয়ান’ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
বিশ্ব র্যাংকিংয়ে এরই মধ্যে এনএসইউ দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথভাবে অবস্থান তৈরি করেছে। বিষয়ভিত্তিক র্যাংকিংয়েও বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন স্কুল ও বিভাগের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। এনএসইউর সায়েন্স স্কুল বিশ্বমঞ্চে ৪০০ ব্যান্ডে, বিজনেস ও সোশ্যাল সায়েন্স ৫০০ ব্যান্ডে এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ৬০০ থেকে ৮০০ ব্যান্ডের মধ্যে অবস্থান করছে। টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়েও এনএসইউ ৮০০ রেঞ্জে রয়েছে।
তবে এসব অর্জনকে তিনি চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখতে চান না। বরং বর্তমান অবস্থানকে পরবর্তী ধাপের ভিত্তি হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, যৌথভাবে শীর্ষ অবস্থানে থাকা একটি ইতিবাচক অর্জন হলেও এনএসইউর আকাঙ্ক্ষা আরও বড়। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এমন একটি অবস্থান তৈরি করা, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে এনএসইউকে এগিয়ে রাখা যায়—এটাই তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী মনে করেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে শুধু ভালো শিক্ষক নিয়োগ বা উন্নত অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসতে হয়। শিক্ষার্থী ভর্তি থেকে শুরু করে পাঠদান, মূল্যায়ন, গবেষণা, প্রশাসন, শিল্পের সঙ্গে সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার প্রস্তুতি—প্রতিটি ধাপকে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডের মধ্যে পরিচালনা করতে হয়।
এখানেই সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, অভিজ্ঞতা এবং বড় পরিসর রয়েছে। দেশের উচ্চশিক্ষার বিকাশে এসব প্রতিষ্ঠানের অবদানও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু আধুনিক বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সমন্বিত হয়নি।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কার্যক্রম ডিগ্রি প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অথচ বর্তমান বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কেবল শিক্ষার্থীকে একটি সনদ দেওয়া নয়। একজন শিক্ষার্থীকে জ্ঞান, দক্ষতা, বিশ্লেষণী সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত যোগ্যতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের উপযোগী করে তোলাও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব।
এনএসইউর শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তিনি তুলে ধরেন ‘সিস্টেম ড্রাইভেন’ বা পদ্ধতিনির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে। তাঁর মতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এনএসইউ শুরু থেকেই একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করার চেষ্টা করেছে। ফলে ব্যক্তি বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে শুধু ব্যবস্থাপনা কাঠামোই এনএসইউর সাফল্যের কারণ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গবেষণায় বিনিয়োগ এবং গবেষণার ফলাফলকে বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা। অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরীর মতে, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তির অন্যতম প্রধান জায়গা হলো গবেষণা। বিশ্ববিদ্যালয় যদি নতুন জ্ঞান তৈরি করতে না পারে, নতুন সমস্যার সমাধান দিতে না পারে এবং শিল্প ও সমাজের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে গবেষণাকে যুক্ত করতে না পারে, তাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।
এ কারণে এনএসইউ গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি একের পর এক আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা সেন্টার তৈরি করছে। এসব কেন্দ্রকে শুধু একাডেমিক গবেষণার জায়গা হিসেবে না দেখে দেশি-বিদেশি গবেষক, প্রতিষ্ঠান ও অর্থায়নকারী সংস্থার সঙ্গে কাজ করার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এর ফলে গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক উৎস থেকে বড় অঙ্কের অর্থায়ন আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও বিস্তৃত হচ্ছে। বিশ্বের শীর্ষ সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণা কার্যক্রমকে তাই এনএসইউর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরীর মতে, আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা কেবল শিক্ষার্থী বিনিময় বা আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তার সুফল খুব বেশি পাওয়া যায় না। প্রকৃত সহযোগিতা তখনই তৈরি হয়, যখন গবেষণা, শিক্ষক উন্নয়ন, যৌথ প্রকল্প, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং জ্ঞান বিনিময়ের মতো কার্যক্রম বাস্তবে পরিচালিত হয়। এনএসইউ সেই জায়গাটিতেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
গবেষণার পাশাপাশি শিল্প খাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ককেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তাঁর মতে, একাডেমিক শিক্ষা এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রের মধ্যে যদি দূরত্ব থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করলেও কর্মজীবনে গিয়ে নতুন করে অনেক কিছু শিখতে বাধ্য হন। এতে শিক্ষার্থী ও নিয়োগদাতা—উভয়েরই সময় ও সম্পদের অপচয় হয়।
এনএসইউর লক্ষ্য তাই শিক্ষার্থীদের এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান সরাসরি কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়। শিল্প খাতের পরিবর্তিত চাহিদা, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং নতুন ধরনের পেশার উত্থান—এসব বিষয়কে একাডেমিক পাঠক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এখানে প্রযুক্তির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। আধুনিক প্রযুক্তিকে শিক্ষার বাইরে রেখে বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা সম্ভব নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিকস, অটোমেশন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মসহ প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনগুলো ইতোমধ্যে কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও এসব পরিবর্তনের সঙ্গে পরিচিত করে তোলা প্রয়োজন।
এনএসইউ তাই কারিগরি দক্ষতা ও আধুনিক প্রযুক্তিকে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টা করছে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিকে শুধু যন্ত্র বা সফটওয়্যার ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না তিনি। বরং প্রযুক্তিকে শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি মাধ্যম হিসেবে দেখতে চান।
অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—চার বছর বা নির্দিষ্ট সময়ের শিক্ষা শেষে একজন শিক্ষার্থী আসলে কী নিয়ে বের হচ্ছে? শুধু একটি ডিগ্রি থাকলেই সেই শিক্ষার্থী ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায় না। পরিবর্তিত শ্রমবাজারে তাকে একই সঙ্গে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগ সক্ষমতা, নেতৃত্ব, দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অর্জন করতে হয়।
তাই এনএসইউর শিক্ষাদর্শনে সফট স্কিলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত না করে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে—এমনটাই মনে করেন তিনি।
তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে শিক্ষার্থীরা যেন শুধু চাকরির বাজারে প্রবেশের অপেক্ষায় না থাকে, বরং নিজেরাই নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সামনে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগও থাকতে হবে। সে নতুন ব্যবসা শুরু করতে পারে, নতুন প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে, নতুন সেবা দিতে পারে কিংবা অন্যদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে—বিশ্ববিদ্যালয়কে সেই সক্ষমতা তৈরির পরিবেশ দিতে হবে।
এই জায়গায় উচ্চশিক্ষার সঙ্গে উদ্যোক্তা তৈরির সম্পর্ককে তিনি ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। কারণ বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে শুধু প্রচলিত চাকরির বাজারের ওপর নির্ভরশীল রাখলে তাদের সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকেও সেই মানসিকতা ও দক্ষতা তৈরির দিকে যেতে হবে।
তবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ছোট করে দেখতে চান না অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী। তাঁর বক্তব্যের মূল জায়গা হলো, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে আধুনিক করতে হবে। পুরনো কাঠামোর শক্তিশালী দিকগুলো ধরে রেখে এর সঙ্গে নতুন ব্যবস্থাপনা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড যুক্ত করতে হবে।
তিনি মনে করেন, বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষায় প্রতিযোগিতা এখন এতটাই তীব্র যে শুধু স্থানীয় সাফল্য দিয়ে সেখানে টিকে থাকা কঠিন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিজের অবস্থান তৈরি করতে হলে গবেষণা প্রকাশনা, গবেষণার প্রভাব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মান, শিল্প খাতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং শিক্ষার্থীদের ফলাফল—সব ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক উন্নতি করতে হবে।
এনএসইউর সামনে তাই দেশের মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের অবস্থান আরও উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে। বিষয়ভিত্তিক র্যাংকিংয়ে বিভিন্ন স্কুলের অবস্থানকে আরও এগিয়ে নেওয়া, গবেষণার পরিধি বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা চলছে।
অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরীর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যকে তিনি কোনো একক সূচকে দেখছেন না। র্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। র্যাংকিংয়ের পেছনে যে একাডেমিক ও গবেষণাগত সক্ষমতা তৈরি করতে হয়, সেটিই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ টেকসইভাবে ভালো অবস্থানে থাকতে হলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের কাঠামো, সংস্কৃতি ও কাজের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হয়।
এই পরিবর্তনের লক্ষ্য শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র্যাংকিং বা গবেষণার সংখ্যা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার প্রভাব শিক্ষার্থীর ওপর পড়ে। শিক্ষার্থী যদি উন্নত শিক্ষা পায়, গবেষণার সুযোগ পায়, প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়, শিল্প খাতের বাস্তবতা বোঝে এবং নিজের ভবিষ্যৎ তৈরির সক্ষমতা অর্জন করে, তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য অর্থবহ হয়ে ওঠে।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির জন্য সেই অর্থে সামনে দুটি সমান্তরাল লক্ষ্য—দেশের উচ্চশিক্ষায় নেতৃত্বের অবস্থান তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক মানচিত্রে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা। অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরীর ভাষায়, লক্ষ্যটি শুধু দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হওয়া নয়। যৌথভাবে শীর্ষে থাকা নয়, বরং স্পষ্ট ব্যবধানে এককভাবে দেশের ‘নাম্বার ওয়ান’ বিশ্ববিদ্যালয় হওয়াই এনএসইউর মূল লক্ষ্য।
এই লক্ষ্য অর্জনের পথ অবশ্য সহজ নয়। র্যাংকিংয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা অনেক দীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক গবেষণা, দক্ষ শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি।
অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরীর বক্তব্যে এনএসইউর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার যে চিত্র উঠে আসে, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে শুধু একটি ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা তৈরির একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। তাঁর বিশ্বাস, পুরনো প্রথাগত কাঠামোর বাইরে এসে সুনির্দিষ্ট, আধুনিক ও পদ্ধতিগত একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।![]()