বাংলা কিউআর মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে: মো. রাফাত উল্লা খান
মো. রাফাত উল্লা খান
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি
রাজু আলীম
বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে ‘এক দেশ, এক কিউআর’ বা বাংলা কিউআর। একটি মাত্র কিউআর কোড ব্যবহার করে সব ব্যাংক ও ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হওয়ায় নগদহীন লেনদেন আরও সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাফাত উল্লা খান। তার মতে, এটি কেবল একটি নতুন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও সমন্বিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বচ্ছ করার একটি জাতীয় উদ্যোগ।
তিনি বলেন, এতদিন একজন ব্যবসায়ীকে বিভিন্ন ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবাদাতার জন্য আলাদা আলাদা কিউআর কোড ব্যবহার করতে হতো। একইভাবে গ্রাহকদেরও কোন অ্যাপ বা কোন ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা যাবে, সেই বিষয়টি নিয়ে দ্বিধায় পড়তে হতো। এই জটিলতা অনেক ক্ষেত্রেই ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করেছে। বাংলা কিউআর সেই বাধা দূর করেছে। এখন একটি কিউআরের মাধ্যমেই বিভিন্ন ব্যাংক ও ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে নির্বিঘ্নে লেনদেন করা সম্ভব। তার ভাষায়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল পেমেন্টকে স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত করতে আন্তঃকার্যক্ষমতার বিকল্প নেই।
বাংলা কিউআর বাস্তবায়নে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক শুরু থেকেই এটিকে একটি জাতীয় অগ্রাধিকারের প্রকল্প হিসেবে দেখেছে বলে জানান মো. রাফাত উল্লা খান। তিনি বলেন, শুধু প্রযুক্তিগত সংযুক্তি সম্পন্ন করাই তাদের লক্ষ্য ছিল না; বরং কীভাবে এই সেবার বাস্তব ব্যবহার বাড়ানো যায়, সেটিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যাংকের আই-ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম ও ইসলামিক ওয়ালেট অ্যাপে বাংলা কিউআর সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশব্যাপী মার্চেন্ট নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। তার মতে, প্রযুক্তি তখনই সফল হয়, যখন তা মানুষের বাস্তব জীবনে সহজে ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে।
ডিজিটাল উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক কেবল কেনাকাটার পেমেন্টেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্যাংকটি শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক সেবাকেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে। মো. রাফাত উল্লা খান জানান, ব্যাংকের ‘ইলমনেট’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলা কিউআর ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের বেতন, ভর্তি ফি এবং অন্যান্য ফি সহজেই ডিজিটালভাবে সংগ্রহ করতে পারছে। এতে অভিভাবকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অর্থ জমা দেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও আরও স্বচ্ছ হচ্ছে।
একইভাবে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুদান ব্যবস্থাকেও ডিজিটাল রূপ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল দানবাক্স’ ব্যবস্থার মাধ্যমে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান নিরাপদে অনুদান গ্রহণ করতে পারছে। এছাড়া ‘ডিজিটাল হাদিয়া’ সেবার মাধ্যমে ইমাম, খতিব, হাফেজ ও ওয়ায়েজদের সম্মানী সরাসরি তাদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। এতে অর্থ লেনদেন যেমন সহজ হচ্ছে, তেমনি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত হচ্ছে। তার মতে, যেখানে আর্থিক লেনদেন রয়েছে, সেখানেই প্রযুক্তিকে মানুষের জন্য আরও সহজ, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করে তোলা প্রয়োজন।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাংলা কিউআরের বিস্তার ঘটাতে এজেন্ট ব্যাংকিং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবার প্রথম পরিচয়ই অনেক ক্ষেত্রে এজেন্ট ব্যাংকিং। এখন এসব এজেন্ট পয়েন্ট কেবল টাকা জমা বা উত্তোলনের কেন্দ্র নয়; বরং ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠছে। এখান থেকেই মার্চেন্ট নিবন্ধন হচ্ছে, গ্রাহকদের বাংলা কিউআর সম্পর্কে জানানো হচ্ছে এবং ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তার প্রত্যাশা, শহরের মতো গ্রামের মুদি দোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা কৃষিপণ্য বিক্রেতারাও সমানভাবে ডিজিটাল অর্থনীতির সুফল ভোগ করবেন।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাংলা কিউআর বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসবে বলেও তিনি মনে করেন। তার ভাষায়, একজন ব্যবসায়ীকে আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য একাধিক কিউআর কোড ব্যবহার করতে হবে না। একটি কিউআরের মাধ্যমেই তিনি বিভিন্ন ব্যাংক ও ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন। এর ফলে ব্যবসা পরিচালনা সহজ হবে এবং প্রতিটি লেনদেনের একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে। ভবিষ্যতে এই লেনদেনের ইতিহাস ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়ন, ঋণ গ্রহণ এবং নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অর্থাৎ ডিজিটাল পেমেন্ট শুধু লেনদেন সহজ করবে না; বরং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করবে।
শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং এবং আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই বলে মন্তব্য করেন মো. রাফাত উল্লা খান। বরং তার মতে, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল ভিত্তিই হচ্ছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিক আর্থিক লেনদেন। ডিজিটাল প্রযুক্তি এই মূল্যবোধগুলোকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ প্রতিটি লেনদেনের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষিত থাকে, ঝুঁকি কমে এবং আর্থিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ হয়। এজন্য আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক নতুন ডিজিটাল সেবা চালুর ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি শরিয়াহ প্রতিপালনের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে।
ডিজিটাল পেমেন্ট বিস্তারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তি নয়, বরং মানুষের মানসিকতা ও অভ্যাস পরিবর্তন—এমনটাই মনে করেন তিনি। তার মতে, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এখন অনেকটাই তৈরি হয়েছে। তবে এখনও অনেক মানুষ নগদ লেনদেনেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কেউ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, আবার কেউ ডিজিটাল লেনদেনের বাস্তব সুবিধা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। তাই ব্যাংকের দায়িত্ব শুধু প্রযুক্তি সরবরাহ করা নয়; বরং গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা তৈরি করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা। কারণ ডিজিটাল অর্থনীতির সফলতা শেষ পর্যন্ত মানুষের বিশ্বাসের ওপরই নির্ভর করে।
সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। মো. রাফাত উল্লা খান জানান, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ভিত্তি হচ্ছে আস্থা। সেই আস্থা ধরে রাখতে মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন, রিয়েল-টাইম জালিয়াতি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভুয়া কিউআর, ফিশিং, অনলাইন প্রতারণাসহ বিভিন্ন সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে গ্রাহকদের সচেতন করতে নিয়মিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তার মতে, অনেক সময় প্রযুক্তির দুর্বলতার চেয়ে ব্যবহারকারীর অসচেতনতাই বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলা কিউআরের প্রভাব শুধু পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, করপোরেট সুশাসন আরও শক্তিশালী হবে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সহজেই আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। প্রতিটি ডিজিটাল লেনদেন একটি তথ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিচয় তৈরি করবে, যা ভবিষ্যতে ঋণ প্রদান, ব্যবসা সম্প্রসারণ, আর্থিক পরিকল্পনা এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলে ডিজিটাল পেমেন্ট কেবল লেনদেনের মাধ্যম নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একটি কার্যকর ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সর্বজনীন রূপে দেখতে চান মো. রাফাত উল্লা খান। তিনি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে ডিজিটাল পেমেন্ট কোনো বিশেষ সেবা হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং মানুষের প্রতিদিনের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হবে। একজন অভিভাবক সন্তানের স্কুলের ফি, একজন ক্রেতা বাজারের বিল, একজন মুসল্লি মসজিদে অনুদান কিংবা একজন ব্যবসায়ী তার প্রতিদিনের লেনদেন—সবকিছু একই ধরনের সহজ, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করতে পারবেন।
তিনি বলেন, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের লক্ষ্য কেবল নতুন প্রযুক্তি চালু করা নয়; বরং এমন একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শরিয়াহসম্মত ডিজিটাল আর্থিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ সমানভাবে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। তার বিশ্বাস, বাংলা কিউআর শুধু একটি পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি বাংলাদেশের স্মার্ট অর্থনীতি গঠনের পথে একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে এবং ভবিষ্যতের নগদহীন অর্থনীতির রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব