যারা ৭১ ভুলে যেতে চায়, তারা বাংলাদেশকে বিশ্বাস করে না: মির্জা ফখরুল
বাংলাদেশে হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে কোনোভাবেই নষ্ট করতে দেওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অস্বীকার করতে চায় বা নতুন প্রজন্মকে ১৯৭১ সালের চেতনাকে ভুলিয়ে দিতে চায়, তারা প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশকেই বিশ্বাস করে না। একই সঙ্গে তিনি ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
শুক্রবার রাজধানীতে ‘সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও মানবাধিকারকর্মীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ শত শত বছর ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং সামাজিক সম্প্রীতির এই ঐতিহ্যই বাংলাদেশের অন্যতম শক্তি। তাই ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বিভাজন সৃষ্টি করার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, “যারা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ভুলে যেতে চায় কিংবা ভুলিয়ে দিতে চায়, তারা কখনোই বাংলাদেশকে বিশ্বাস করে না। স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং আমাদের জাতীয় পরিচয় পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই ইতিহাসকে অস্বীকার করে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়।”
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে দেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। তাঁর ভাষায়, গত ১৫ বছরে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করা হয়েছিল এবং মানুষের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, “বিগত ১৫ বছরে দেশের গণতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। এখন আমাদের সামনে নতুন সুযোগ এসেছে। অতীতের সেই ক্ষত কাটিয়ে আমরা একটি অংশগ্রহণমূলক, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই।”
মির্জা ফখরুল বলেন, দেশে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিভিন্ন সময় ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। তারা গুজব, উসকানি ও অপপ্রচারের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়। এসব অপচেষ্টা প্রতিহত করতে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, ধর্মীয় নেতা এবং সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, “সামনে অনেক সমস্যা ও বড় বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জুলাই আন্দোলনকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সেই আন্দোলন মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ ছিল। কিন্তু একই সময়ে যারা ধর্মকে ব্যবহার করে সমাজে ফাটল ধরাতে চায়, তাদের যে কোনো মূল্যে রুখে দিতে হবে।”
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শক্তি তার বৈচিত্র্যে। বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষ মিলেই বাংলাদেশের পরিচয় গড়ে উঠেছে। এই বৈচিত্র্যকে দুর্বল নয়, বরং রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কোনো নাগরিক যেন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্য, ভয় বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, “সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা বিধান, সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং আইনের সমান সুরক্ষা দেওয়াই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেক নাগরিক সমান মর্যাদার অধিকারী।”
মির্জা ফখরুল বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ক্ষেত্রে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং ধর্মীয় নেতাদেরও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। ঘৃণা, বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতিকে পরিহার করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, নতুন বাংলাদেশ হবে এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিক সমান সুযোগ, সমান অধিকার ও নিরাপত্তা ভোগ করবেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধকে ভিত্তি করেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
মতবিনিময় সভায় বক্তারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা জোরদার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা নিশ্চিত, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচার এবং সব নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, বাংলাদেশকে সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বিশ্বের সামনে আরও শক্ত অবস্থানে তুলে ধরতে হলে সব ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি ও বিভেদমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে হবে।