অনিয়ম, জালিয়াতি ও আর্থিক দুরবস্থার কারণে দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে না পারা চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের অর্থ ফেরাতে সরকারের পক্ষ থেকে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে এই অর্থ থেকে আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়, সম্পদ বিক্রি ও অন্যান্য পাওনা আদায়ের মাধ্যমে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা আমানতকারীদের মধ্যে আনুপাতিক হারে বিতরণ করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, অবসায়নের চূড়ান্ত ধাপে থাকা ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, আভিভা ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন। আভিভা ফাইন্যান্সে মো. আলাউদ্দিন হোসেন, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে আবু সামা মো. আতাউর রহমান এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে মো. সাদেকুর রহমানকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগ পাওয়া চার প্রশাসকই বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তা। তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে দুজন করে সহযোগী প্রশাসক দেওয়া হয়েছে। প্রশাসকদের মূল দায়িত্ব হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ, দায়, ঋণ ও আমানতের হিসাব নিরূপণ করা, সম্পদ সংরক্ষণ করা এবং অবসায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সরকার যে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা দেবে, সেটি আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের প্রাথমিক ধাপে ব্যবহার করা হবে। এরপর প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ আদায় ও সম্পদ বিক্রি করে অর্থ পাওয়া গেলে তা পর্যায়ক্রমে আমানতকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
এ উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অর্থ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা আমানতকারীরা অন্তত একটি অংশ দ্রুত ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে পুরো আমানত ফেরত দিতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও ঋণ আদায়ের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হবে।
পিপলস লিজিংয়েও প্রশাসক দেওয়ার প্রস্তুতি
অবসায়নের চূড়ান্ত তালিকায় থাকা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসেও প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে আদালতে জটিলতা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, আদালতের নিয়োগ দেওয়া পরিচালনা পর্ষদ বর্তমানে পিপলস লিজিংয়ে রয়েছে। ওই পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের জন্য আদালতে আবেদন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আদালতের সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পিপলস লিজিংয়ের অবসায়ন নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। প্রতিষ্ঠানটির বড় অঙ্কের আমানত আটকে রয়েছে। ফলে প্রশাসক নিয়োগের পর ঋণ আদায় ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ ফেরানোর প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও চার প্রতিষ্ঠানকে সময়
এদিকে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরও চারটিকে পরিস্থিতি উন্নতির জন্য সময় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স অ্যান্ড কোম্পানি এবং প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসব প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক পরিস্থিতি উন্নত করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হলে এসব প্রতিষ্ঠানকেও অবসায়নের আওতায় আনা হতে পারে।
এর আগে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ২০টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানকে কেন বন্ধ করে দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে গত বছর চিঠি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধাপের পর নয়টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের জন্য চূড়ান্তভাবে বিবেচনায় আসে। এর মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে পরিস্থিতি উন্নতির জন্য সময় দেওয়া হয়।
বর্তমানে চারটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পিপলস লিজিংয়ের ক্ষেত্রে আদালতের সিদ্ধান্তের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে আর্থিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আমানতকারীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন বা বন্ধ হয়ে গেলে একজন আমানতকারী আমানত বিমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ পান। এর বেশি অর্থ থাকলে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ পুনরুদ্ধার, সম্পদ বিক্রি ও অন্যান্য পাওনা আদায়ের পর প্রাপ্ত অর্থ থেকে আনুপাতিক হারে তা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে এবার অবসায়নের আওতায় আসা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকারীদের অর্থ ফেরাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের দেওয়া ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা থেকে প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এতে আমানত বিমার প্রচলিত সীমার তুলনায় আমানতকারীরা বেশি অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে কার কত টাকা ফেরত দেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে থাকা আমানতের ধরন ও প্রযোজ্য নীতিমালার ওপর নির্ভর করবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক অর্থ ফেরতের পর খেলাপি ঋণ আদায় ও সম্পদ বিক্রির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের ঋণ অনাদায়ী রয়েছে, সেসব ঋণ দ্রুত আদায় করা না গেলে আমানতকারীদের বাকি অর্থ ফেরত দিতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
ব্যক্তি আমানত তিন হাজার কোটি টাকা
অবসায়নের প্রক্রিয়ায় থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ব্যক্তি আমানতকারীদের বড় অঙ্কের অর্থ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট আমানত প্রায় ১৩ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এর বাইরে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ২০২ কোটি টাকা।
মোট আমানতের মধ্যে ব্যক্তি আমানত রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যক্তি আমানতকারীদের ওপরও।
পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে আমানত রয়েছে ৩ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৪৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানত রয়েছে ১ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে আমানত রয়েছে ৩ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানত ৬৪৬ কোটি টাকা।
আভিভা ফাইন্যান্সে আমানতের পরিমাণ ৫ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির ব্যক্তি আমানত রয়েছে ৮১০ কোটি টাকা।
এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে আমানত রয়েছে ৩৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানত ১০৫ কোটি টাকা।
ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের আমানত রয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৩৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানত মাত্র ৩৬ কোটি টাকা।
এই হিসাব থেকে দেখা যায়, অবসায়নের প্রক্রিয়ায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দায় শুধু ব্যক্তি আমানতকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থও এসব প্রতিষ্ঠানে আটকে আছে।
ঋণ আদায়ই বড় চ্যালেঞ্জ
অবসায়ন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে খেলাপি ঋণ আদায় ও সম্পদ নগদায়ন। বছরের পর বছর দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের ঋণ অনাদায়ী হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণের বিপরীতে নেওয়া জামানতের মূল্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
প্রশাসকদের দায়িত্ব হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও দায়ের প্রকৃত চিত্র বের করা। পাশাপাশি কার কাছে কত ঋণ রয়েছে, কোন ঋণ আদায়যোগ্য এবং কোন সম্পদ বিক্রি করা সম্ভব—এসব বিষয় চিহ্নিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে আমানত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করলে সাময়িকভাবে আমানতকারীদের স্বস্তি মিলবে। কিন্তু আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ঋণ আদায় এবং সম্পদ পুনরুদ্ধার জরুরি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এখন দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে লোকসান ও তারল্যসংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল সময় না দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার অংশ হিসেবেই অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে অবসায়ন শেষ করতে কত সময় লাগবে এবং আমানতকারীরা শেষ পর্যন্ত কত শতাংশ অর্থ ফেরত পাবেন, তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও ঋণ আদায়ের ওপর। সরকারের প্রাথমিক ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার সহায়তা আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু করবে। কিন্তু পুরো অর্থ ফেরতের জন্য প্রশাসকদের দক্ষতা, ঋণ আদায়ের গতি এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।