জেরিন হান্নান
মাইন্ড স্পার্ক স্টুডিও
ঠিক ২ বছর ৯ দিন পরে আজ প্রথমবার প্রকাশ্যে লিখছি, ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর…..একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমি সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছিলাম ||
বছরে এক থেকে দেড় কোটি টাকার লেনদেন হতো যে প্রতিষ্ঠানে, সেদিন সেই প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে ছিল মাত্র ২,০০০ টাকা।
বনশ্রীতে আমার মাছের হাট বাজার এর দোকানের শাটার নামিয়ে দিয়েছিলাম।
সম্ভবত সেদিনই আমার উদ্যোক্তা জীবনেরও শাটার নেমে যাওয়ার কথা ছিল।
আজ এতদিন পর এই গল্পটা প্রথমবার প্রকাশ্যে লিখছি।
আমার প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিন বছর হেড অব অপারেশন হিসেবে কাজ করেছিল একটি ছেলে। প্রথম দুই বছর তার মতো পরিশ্রমী, ডেডিকেটেড মানুষ খুব কম দেখেছি।
দুই বছরে দুই দিনও ছুটি নেয়নি। যেদিন সবচেয়ে কম কাজ করেছে, সেদিনও ১৬–১৭ ঘণ্টা কাজ করেছে।![]()
স্বাভাবিকভাবেই একটা সময় তার ওপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল।
এরপর ব্যবসার ধরন বদলাল।
তৃতীয় পক্ষ বাদ দিয়ে আমরা সরাসরি জেলেদের কাছ থেকে ক্যাশ টাকায় মাছ কেনা শুরু করলাম।
আর সম্ভবত ঠিক সেখান থেকেই হিসাবটাও বদলাতে শুরু করল।
আমি মোহাম্মদপুর থেকে সিএনজিতে বনশ্রীর দোকানে যেতাম, আর একসময় দেখলাম সে গাড়ি কিনেছে। কিছুই মনে করিনি। মানুষ টাকা জমায়, পরিবার সাহায্য করে, পুরোনো গাড়ি কেনে, অস্বাভাবিক কী?
কিন্তু প্রায় ছয় মাস পর যখন দ্বিতীয় গাড়ি কেনার কথা শুনলাম, প্রথমবার আমার ভেতরে একটু মোচড় দিল।
তারপর শুরু করলাম খোঁজ নেওয়া।
প্রায় পাঁচ-ছয় মাস ধরে একটা একটা করে হিসাব সামনে আসতে শুরু করল।
দোকানে নিয়মিত না যাওয়া,
সাপ্লায়ারদের বিল বাকি রাখা,
একজনের কাজের জায়গায় দুজন লোক নিয়োগ দেওয়া,
হোয়াটসঅ্যাপে আসা অর্ডারের হিসাব যথাযথভাবে না দেখানো…….একসময় বুঝলাম, আমার বিশ্বাস আর আমার ব্যবসার বাস্তব হিসাব এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই।
আমি কিছুই বুঝতে দিইনি।![]()
প্রথমে আমার পেজের অ্যাকসেস থেকে সরিয়ে দিলাম।
তারপর মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে তাকে এবং তার নিয়োগ দেওয়া পুরো টিমকে চাকরি থেকে বাদ দিলাম।
একই দিনে বনশ্রীর দোকানের শাটারও নামিয়ে দিলাম।
তারপর অ্যাকাউন্ট দেখলাম……২,০০০ টাকা ||
যে ব্যবসা বছরে কোটি টাকার ওপরে লেনদেন দেখেছে, সেই ব্যবসার মালিক হিসেবে দাঁড়িয়ে আমার হাতে সেদিন কার্যত কিছুই ছিল না।
আমার হিসাবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১০–১৫ লক্ষ টাকার কম ছিল না।
গল্পটা সেখানেও শেষ হয়নি।
চাকরি থেকে চলে যাওয়ার পর আমার ব্যবসায় কাজ করতে গিয়ে পাওয়া অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে মাছের নতুন পেজ খুলেছিল। আমার প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা হাজার হাজার গ্রাহকের মধ্যে অনেককে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে অর্ডার নেওয়ার চেষ্টার কথাও পরে কয়েকজন গ্রাহকের কাছ থেকেই জানতে পারি। সেটা জানতে পারা মাত্র আমি প্রফেশনালি বিষয়টি হ্যান্ডেল করি।
এবার একটা অদ্ভুত কথা বলি।
আমি চাইলে আইনের আশ্রয় নিতে পারতাম।
নিইনি।
আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম।
এমনকি এতকিছুর পরেও তার এনওসি-তে আমি সই করেছি।
চরিত্র সনদ চেয়েছে, দিয়েছি।
চাকরির জন্য যেখানে আমার সহযোগিতা প্রয়োজন হয়েছে, যতটা পেরেছি করেছি।
কারণ একটা সময় পরে আমার মনে হয়েছিল….আমার টাকা গেছে। আমার ব্যবসা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখন আমি যদি আমার বাকি শক্তিটাও প্রতিশোধের পেছনে খরচ করি, তাহলে আমার কাছে নতুন করে শুরু করার জন্য আর কী থাকবে?
তাই মানুষটার পেছনে ছুটিনি।
নিজের ব্যবসাটার পেছনে ছুটেছি।
এবং মজার ব্যাপার কী জানেন?
এত বড় ক্ষতি করেও সে অজান্তে আমার একটা উপকার করে দিয়ে গিয়েছিল।
সে চলে যাওয়ার পর আমি আর অফিসে বসে মাছের ব্যবসা করিনি।
আমি নিজেই সামনে চলে এসেছি।
আড়তে ঢুকেছি।
জেলেদের কাছে গিয়েছি।
নদীতে নেমেছি।
নিজের ব্যবসার প্রতিটা স্তর নিজের চোখে দেখতে শুরু করেছি।
তারপর এলো…..২ অক্টোবর, ২০২৪।
আবার শুরু করলাম।
একেবারে শূন্য থেকে।
২৩ সেপ্টেম্বর যে মানুষটা ২,০০০ টাকার একটা প্রতিষ্ঠানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, মাত্র কয়েকদিন পর সেই মানুষটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল…..ব্যবসা শেষ হয়নি। শুধু আগের অধ্যায়টা শেষ হয়েছে ||
আজ মাছের হাট বাজারকে দেখে অনেকের মনে হতে পারে, আমার ব্যবসা তো ভালোই চলে। আমি হয়তো খুব আরামেই এত বছর ব্যবসা করে এসেছি।
তাদের জন্যই আজ প্রথমবার এই গল্পটা বললাম। “কারণ একটা প্রতিষ্ঠানের আজকের অবস্থান দেখে তার মালিকের গতকালের ব্যাংক ব্যালেন্স বোঝা যায় না।”
তার হাসিমুখের ছবি দেখে বোঝা যায় না, একদিন সেই একই মানুষ নিজের প্রতিষ্ঠানের শাটার নামিয়ে ভেবেছিল, এরপর কী?
আর প্রতিষ্ঠিত একটা ব্যবসা একেবারে শূন্যে নেমে গেলে একজন উদ্যোক্তার বুকের ভেতর কী চলে, সেটা সম্ভবত শুধু সেই উদ্যোক্তাই জানে।
আমি ভেঙে পড়িনি…..এটা বললে মিথ্যা হবে না, কিন্তু সহজ ছিল বললেও মিথ্যা হবে।
শুধু একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম……যে আমার ক্ষতি করেছে, তাকে শেষ করতে গিয়ে আমি আমার বাকি জীবন নষ্ট করব না। বরং যা বাকি আছে, সেটা দিয়ে আবার নিজেকে দাঁড় করাব।
ক্ষমা করে দিয়েছিলাম।
তারপর নিজের হিসাবটা আল্লাহর কাছে ছেড়ে দিয়ে আবার কাজে নেমেছিলাম।
আজ এতদিন পরে পেছনে তাকিয়ে আমার শুধু মনে হয়…..
কিছু মানুষ আপনার ব্যবসা থেকে টাকা নিয়ে যেতে পারে।
কাস্টমার নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
আপনার বিশ্বাস ভাঙতে পারে।
এমনকি আপনার প্রতিষ্ঠানের শাটারও নামিয়ে দিতে পারে।
কিন্তু একটা জিনিস নিয়ে যেতে পারবে না,
“আপনার আবার শূন্য থেকে শুরু করার সাহস।”
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪…..আমি প্রায় সর্বস্বান্ত হয়েছিলাম।
২ অক্টোবর, ২০২৪…..আমি আবার উদ্যোক্তা হয়েছিলাম।
মাঝখানে ছিল মাত্র কয়েকটা দিন। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, ওই কয়েকটা দিনের মধ্যেই আমার ব্যবসায়িক জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা লেখা হয়ে গিয়েছিল…..ব্যবসায় শূন্য হয়ে যাওয়া আর শেষ হয়ে যাওয়া এক জিনিস নয়।
![]()
![]()