ধ্বংসস্তূপের নিচে স্বজনদের খুঁজছেন মানুষ। কোথাও চলছে ভারী যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ, কোথাও খালি হাতে উদ্ধারের চেষ্টা। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে উদ্বেগ। কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষ।
সোমবার ভোরে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির পশ্চিমাঞ্চল। কয়েক মুহূর্তের তীব্র কম্পনে ধসে পড়ে বহু ভবন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় যোগাযোগব্যবস্থা ও জরুরি সেবা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে ক্যালি, কিবদো ও পেরেইরা শহর।
ভূমিকম্পের দ্বিতীয় দিনেও ধসে পড়া ভবনের স্তূপে চলছে উদ্ধার অভিযান। উদ্ধারকারীরা ভারী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করে জীবিতদের সন্ধান করছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ভূমিকম্পে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা পুরোপুরি ধসে পড়েছে। নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে পেতে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন নাগরিক উদ্যোগে পরিচালিত ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশ করছেন। নিখোঁজের সংখ্যা বেশি হওয়ায় উদ্ধার ও শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে চোকো প্রদেশ। কলম্বিয়ার অন্যতম দরিদ্র এ অঞ্চলে এখনো ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি। প্রদেশটির রাজধানী কিবদোর স্থানীয় কর্মকর্তা জেনি রিভাস জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে শহরের সেবা খাত ও যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি সেখানে জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পেরেইরার বাসিন্দা মোনিকা সানচেজ ভূমিকম্পের ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, ভূমিকম্পের সময় তার কারখানার ভেতরের একটি দেয়াল ধসে পড়ে। তিনি ও তার ১২ কর্মী কোনো রকমে শেষ মুহূর্তে ভবন থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।
সানচেজ বলেন, মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। মনে হচ্ছিল, চারপাশের পুরো শহরটাই যেন ধসে পড়ছে।
পেরেইরার আরেক বাসিন্দা ও ট্যাটু শিল্পী আন্দ্রেস হার্নান্দেজ জানান, ভূমিকম্পের পর থেকেই ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কায় তিনি আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। ভয়াবহ সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, দৃশ্যটি যেন সিনেমার মতো মনে হচ্ছিল। পিলার, কেবলসহ চারপাশের সবকিছু দুলছিল। নিজের পরিবার ও বন্ধুদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।![]()
ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি তৎপরতা জোরদার করেছে কলম্বিয়া সরকার। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সোমবার রাতে কিবদো সফর করেন প্রেসিডেন্ট আবেলর্দো দে লা এস্প্রিয়েলা। তিনি উদ্ধারকাজে প্রকৌশলী, বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল ও প্রশিক্ষিত কুকুর মোতায়েনের ঘোষণা দেন। পাশাপাশি সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদেরও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্যও সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। প্রেসিডেন্ট জানান, যেসব মানুষের ঘরবাড়ি ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সংস্কারকাজ চলাকালে তাদের ভাড়া সহায়তা দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও সহায়তা আসতে শুরু করেছে। জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন, খাদ্য ও অন্যান্য মানবিক সহায়তার জন্য সাড়ে ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশও কলম্বিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে উদ্ধারকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন সময়। ভূমিকম্পের পর প্রতিটি ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা কমে আসতে পারে। তাই নিখোঁজ ২ হাজার ৭০০ জনের সন্ধানে সর্বশক্তি দিয়ে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
কর্তৃপক্ষ বলছে, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেতে আরও সময় লাগবে। দুর্গম ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হলে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও স্পষ্ট হবে।![]()