ফুটওয়্যার রফতানিতে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। গত কয়েক বছরে দেশটিতে বাংলাদেশের তৈরি জুতার রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ফুটওয়্যার রফতানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫২ শতাংশ বেড়ে ৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের মোট ফুটওয়্যার রফতানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের রফতানি পরিসংখ্যানেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ফুটওয়্যারের শক্ত অবস্থান দেখা যাচ্ছে। ওই অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে মোট ১২২ কোটি ২৭ লাখ ৮৪ হাজার ৬০৯ ডলারের ফুটওয়্যার রফতানি করেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গেছে ৩৮ কোটি ৬৮ লাখ ৩৪ হাজার ১৪৭ ডলারের পণ্য। অর্থাৎ দেশের মোট ফুটওয়্যার রফতানির ৩১ দশমিক ৬৪ শতাংশের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে মোট পণ্য রফতানি হয়েছে ৯০৪ কোটি ৮০ লাখ ৪৬ হাজার ৮৩৯ ডলারের। এর মধ্যে ফুটওয়্যারের অংশ ৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। অর্থমূল্যের হিসাবে তৈরি পোশাকের পর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রফতানি পণ্য এখন ফুটওয়্যার।
বিশাল ভোক্তা বাজারের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জুতা শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফুটওয়্যার ডিস্ট্রিবিউটর্স অ্যান্ড রিটেইলার্স অব আমেরিকার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জুতা বিক্রির বার্ষিক বাজারমূল্য ১২১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। একই বছর দেশটির ভোক্তারা মাথাপিছু গড়ে প্রায় ছয় জোড়া জুতা আমদানি করেছেন।
এই বাজারে কেনাকাটার ধরনও দ্রুত বদলাচ্ছে। ২০২৫ সালের ছুটির মৌসুমকে কেন্দ্র করে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, জুতা কিনতে আগ্রহী মার্কিন ভোক্তাদের ৫৬ শতাংশ দোকান থেকে এবং ৪৪ শতাংশ অনলাইনে কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন। দোকান থেকে কেনার ক্ষেত্রে বিশেষায়িত ফুটওয়্যার চেইনগুলো ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। অনলাইনে অ্যামাজন, জ্যাপোসসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ছিল বড় গন্তব্য।
এত বড় বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখনো সীমিত। তবে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি বলছে, দেশটির তৈরি জুতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজার ডলারের ফুটওয়্যার রফতানি হয়েছে। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল ২৫ কোটি ৫২ লাখ ১০ হাজার ডলার।
রফতানি বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক সোর্সিং ব্যবস্থার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা কয়েক বছর ধরে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎপাদন উৎস খুঁজছেন। এতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ নতুন সুযোগ পাচ্ছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ফুটওয়্যার আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২ হাজার ৫১২ কোটি ডলার। এর মধ্যে ভিয়েতনাম একাই সরবরাহ করেছে প্রায় ৯৪৩ কোটি ডলারের জুতা। চীন থেকে আমদানি কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারে। একই সময়ে ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও ভারত থেকেও আমদানি বেড়েছে।
এই পরিবর্তিত সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে। তবে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ এখনো ভিয়েতনাম, চীন বা ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ফলে বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি বাজার সম্প্রসারণে রূপ দিতে উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের বৈচিত্র্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
বাংলাদেশের ফুটওয়্যার খাতের প্রচলিত শক্তি মূলত চামড়ার জুতা। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া ৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের ফুটওয়্যারের মধ্যে ৩৪ কোটি ৩৭ লাখ ডলারই ছিল চামড়াজাত জুতা। অর্থাৎ মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান অনেকটাই চামড়ার জুতার ওপর নির্ভরশীল।
তবে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির জন্য চামড়াবহির্ভূত ফুটওয়্যারের দিকে নজর বাড়াতে হবে। রাবার, প্লাস্টিক, সিনথেটিক ও টেক্সটাইলনির্ভর জুতার বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে স্পোর্টস, ক্যাজুয়াল ও লাইফস্টাইল ফুটওয়্যারের বাজারে এসব উপকরণের ব্যবহার বেশি। বাংলাদেশেও এ ধরনের জুতা উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৫৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের চামড়াবহির্ভূত ফুটওয়্যার রফতানি করেছে। তবে আগের বছরের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে সামগ্রিক ফুটওয়্যার রফতানির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে চামড়াবহির্ভূত পণ্যের উৎপাদন ও রফতানি বাড়ানো এখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্যেও চামড়া ও ফুটওয়্যারকে তৈরি পোশাকের পর দেশের অন্যতম বড় রফতানি খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত এক দশকে চামড়াবহির্ভূত ফুটওয়্যার রফতানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু কম উৎপাদন ব্যয় আর সস্তা শ্রম দিয়ে বাজার সম্প্রসারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে একটি জুতা পৌঁছানোর আগে বাংলাদেশের কারখানাকে একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। ক্রেতার নকশা অনুযায়ী নমুনা তৈরি, অনুমোদন, কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং এবং নির্ধারিত সময়ে জাহাজীকরণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক ক্রেতার শর্ত পূরণ করতে হয়। বড় অর্ডারের পাশাপাশি দ্রুত সরবরাহের সক্ষমতাও এখন ক্রেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় ফুটওয়্যার রফতানিকারক এপেক্স ফুটওয়্যার। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যানুযায়ী, তারা মূলত অরিজিনাল ডিজাইন ম্যানুফ্যাকচারিং মডেলে কাজ করে। বাংলাদেশ থেকে চামড়ার জুতা রফতানিতে প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে। তাদের উৎপাদন ব্যবস্থায় পাঁচটি অ্যাসেম্বলি লাইন রয়েছে এবং প্রতি শিফটে ৫ হাজার ৫০০ জোড়া পর্যন্ত জুতা উৎপাদনের সক্ষমতার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। উত্তর আমেরিকার বাজারেও তাদের ব্যবসায়িক উপস্থিতি রয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় পরিসরে প্রবেশ করতে হলে বাংলাদেশের জন্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়। দ্রুত অর্ডার সম্পন্ন করা, মানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এর সঙ্গে কাঁচামালের সহজলভ্যতা, জ্বালানি, পরিবহন, বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ফুটওয়্যার রফতানিকারকদের জন্য লিড টাইম এখন বড় প্রতিযোগিতামূলক বিষয়। অর্ডার পাওয়ার পর পণ্য উৎপাদন ও গন্তব্য বাজারে পৌঁছাতে যত বেশি সময় লাগে, ক্রেতার কাছে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তত দুর্বল হয়। তাই কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা, বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বাধা কমানো জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতার আরেকটি দিক হলো ক্রেতার পছন্দের দ্রুত পরিবর্তন। নাইকি, অ্যাডিডাস ও স্কেচার্সের মতো বড় ব্র্যান্ডগুলোর পাশাপাশি অন রানিং ও সালোমনের মতো নতুন ব্র্যান্ডও বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ফলে উৎপাদকদের দ্রুত নতুন নকশা, উপকরণ ও পণ্যের ধরন বাজারে আনার সক্ষমতা প্রয়োজন হচ্ছে।
এদিকে মার্কিন ভোক্তাদের মূল্যসংবেদনশীলতাও বাড়ছে। মূল্যছাড় ও তুলনামূলক কম দামের পণ্যের চাহিদা বাড়ায় সরবরাহকারীদের জন্য উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পণ্যের মান ধরে রাখা জরুরি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশি রফতানিকারকদের জন্য এ জায়গায় ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেশটির তৈরি ফুটওয়্যারের পরিচিতি বাড়ছে। চীন থেকে সোর্সিংয়ের বিকল্প খুঁজতে থাকা বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে একটি সম্ভাবনাময় উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে জায়গা তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন সেই সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্কে পরিণত করা।
এ জন্য চামড়ার জুতার পাশাপাশি স্পোর্টস, ক্যাজুয়াল, স্যান্ডেল, বুট এবং অন্যান্য চামড়াবহির্ভূত পণ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে টেকসই উৎপাদন, আন্তর্জাতিক শ্রম ও পরিবেশগত মান, নতুন প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান বলছে, ফুটওয়্যার ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের রফতানি ঝুড়িতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ পণ্যের রফতানি মোট ফুটওয়্যার রফতানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে তৈরি পোশাকনির্ভর রফতানি কাঠামো থেকে বেরিয়ে বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে ফুটওয়্যার বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম বড় জুতার বাজার যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি সেই সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে শুধু বেশি জুতা উৎপাদন নয়, বরং বেশি বৈচিত্র্যের পণ্য, উন্নত মান, কম লিড টাইম এবং প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই বর্তমান বাজারের অংশীদারত্ব ভবিষ্যতে বড় রফতানি সম্ভাবনায় রূপ নিতে পারে।