বিশেষ প্রতিবেদক
ঢাকা
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) পরিবর্তে পুলিশ বাহিনীর আওতায় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের আইনের খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। একই সঙ্গে র্যাবের জনবল, ক্ষমতা, সম্পদ, তহবিল, সম্পত্তি, হিসাব, রেকর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সব ধরনের প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক উপাদান নতুন ইউনিটটির কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে দেশের বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন করা হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
মন্ত্রিসভার অনুমোদিত খসড়ায় বলা হয়েছে, বিদ্যমান র্যাবের পরিবর্তে পুলিশ বাহিনীর আওতায় এসআরবি প্রতিষ্ঠা করা হবে। নতুন এই ইউনিটকে বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। খসড়াটি লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে র্যাবের বিদ্যমান কাঠামো থেকে এসআরবিতে জনবল ও সম্পদ স্থানান্তর। খসড়ায় র্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, সম্পত্তি, হিসাব, রেকর্ড এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সম্পদ এসআরবির কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন ইউনিট প্রতিষ্ঠার পর র্যাবের বর্তমান সাংগঠনিক সক্ষমতা ও সম্পদের একটি বড় অংশ সরাসরি এসআরবির কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হবে।
এর ফলে এসআরবি প্রতিষ্ঠা কেবল একটি নতুন ইউনিট গঠনের বিষয় নয়; বরং র্যাবের বিদ্যমান কাঠামোকে নতুন আইন ও নতুন নামের অধীনে পুনর্গঠনের একটি প্রক্রিয়াও হবে। একই সঙ্গে র্যাবের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা কীভাবে নতুন ইউনিটের মাধ্যমে বজায় রাখা হবে, তার জন্যও খসড়া আইনে বিভিন্ন প্রশাসনিক বিধান রাখা হয়েছে।
এসআরবির কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও নতুন আইনের খসড়ায় গুরুত্ব পেয়েছে। নাগরিকদের অভিযোগ এবং ইউনিটটির সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিষ্পত্তির জন্য একটি বহুপক্ষীয় অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এ কমিটির মাধ্যমে এসআরবির বিরুদ্ধে নাগরিকদের অভিযোগ এবং বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিরসনের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ থাকবে।
বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। নতুন আইনে অভিযোগ প্রতিকারের জন্য বহুপক্ষীয় কমিটির বিধান যুক্ত হওয়ায় এসআরবির কার্যক্রমে জবাবদিহির কাঠামো আরও সুস্পষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
খসড়ায় রূপান্তরকালীন প্রশাসনিক কার্যক্রম চালু রাখার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নতুন বিধিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত র্যাবসংক্রান্ত বিদ্যমান বিভাগীয় কার্যধারার বিধিমালা প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ বহাল থাকবে। ফলে র্যাব থেকে এসআরবিতে রূপান্তরের সময় বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে চলমান বিভাগীয় কার্যক্রম বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আইনি শূন্যতা তৈরি হবে না।
র্যাব প্রতিষ্ঠার ইতিহাস দুই দশকেরও বেশি পুরোনো। ২০০৪ সালের মার্চে তৎকালীন বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় র্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়। পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস, কোস্টগার্ড ও আনসারের সদস্যদের সমন্বয়ে বিশেষ এই ইউনিট গঠন করা হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই র্যাবকে সন্ত্রাস দমন, জঙ্গিবাদ মোকাবিলা, মাদকবিরোধী অভিযান, অস্ত্র উদ্ধার, অপহরণ ও গুরুতর অপরাধ দমনের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ অভিযান পরিচালনা ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাহিনীটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তৈরি হয়।
তবে সময়ের সঙ্গে র্যাবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগও সামনে আসে। বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাহিনীটি সমালোচনার মুখে পড়ে। এসব অভিযোগের কারণে র্যাবের কার্যক্রম, সাংগঠনিক কাঠামো ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলে আসছে।
নতুন এসআরবি আইন সেই বিতর্কের প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ নতুন ইউনিটের জন্য পৃথক আইনি কাঠামো তৈরি করার পাশাপাশি অভিযোগ প্রতিকার, জনবল ও সম্পদ স্থানান্তর এবং পুরোনো বিভাগীয় বিধিমালা বহাল রাখার মতো বিষয়গুলোকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
তবে এসআরবির দায়িত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো, অধস্তনতা, অভিযান পরিচালনার এখতিয়ার এবং বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের বিস্তারিত বিষয়গুলো নতুন আইন ও পরবর্তী বিধিমালায় আরও স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষায়িত এই ইউনিটের কার্যক্রম কোন কোন ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং কোন ধরনের অভিযানে কী ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে, তা বাস্তবায়ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
র্যাবের জনবল ও সম্পদ এসআরবিতে স্থানান্তরের বিধান থাকায় নতুন বাহিনী প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতাও বজায় থাকবে। এতে নতুন করে একটি বড় বাহিনী গড়ে তোলার পরিবর্তে বিদ্যমান অবকাঠামো ও জনবল ব্যবহার করে এসআরবিকে কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে র্যাবের নামে পরিচালিত কার্যক্রম ও সম্পদের ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আসবে।
মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়া খসড়াটি এখন ভেটিংসহ পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। এরপর সংসদে বিল আকারে উত্থাপন ও আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এসআরবি আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে শুধু নাম পরিবর্তন নয়, বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগ, মানবাধিকার সুরক্ষা, অভিযোগ তদন্ত, অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। তাই র্যাবের পরিবর্তে এসআরবি প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন আইনের পাশাপাশি বিধিমালা ও কার্যপ্রণালিতেও এসব বিষয় কতটা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রায় ২২ বছর ধরে বিদ্যমান র্যাব কাঠামোর পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলো। নতুন আইনের মাধ্যমে এসআরবিকে কী ধরনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং র্যাবের অভিজ্ঞতা থেকে কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনা হয়, তা আগামী দিনের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।