সৌদি আরবে বসবাসরত প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার হাতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকার বিষয়টি এখন আর নিছক প্রশাসনিক ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কয়েক দশক আগে ভুল বা অনিয়মের মাধ্যমে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়া এসব ব্যক্তির নথি নবায়নের সিদ্ধান্ত একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শ্রম ও কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এনেছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়, জাতীয় নিরাপত্তা এবং রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের হিসাবে দেশটিতে প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে অবস্থান করছেন। তাদের বড় একটি অংশ ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে পাকিস্তানি পাসপোর্টসহ বিভিন্ন নথির মাধ্যমে সৌদি আরবে যান। ওই সময়ে বাংলাদেশকে সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে পরবর্তী সময়ে কীভাবে এসব ব্যক্তি বাংলাদেশি পরিচয়ে পাসপোর্ট পেলেন, কোন নথির ভিত্তিতে তাদের নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল এবং সেই নথিগুলো কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো সামনে আসেনি।
২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন জানিয়েছিলেন, অতীতে বাংলাদেশের ভুল ও দুর্নীতির কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। হাতে লেখা পাসপোর্টের সময়ে এমন অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রায় ৬৯ হাজার ব্যক্তির পাসপোর্ট নবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে সরকারের ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ছিল—পাসপোর্ট দেওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া নয়। বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো রাষ্ট্র নাগরিকত্ব না দিয়েও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ভ্রমণনথি দিতে পারে। কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যাখ্যাকে বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সেটি স্পষ্ট করা জরুরি। কারণ বাংলাদেশি পাসপোর্ট একটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে একজন ব্যক্তির নাগরিকত্ব নির্ধারণ না করেই তাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক পদ্ধতি কী হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
রোহিঙ্গাদের পাসপোর্টের সংখ্যা নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। অতীতে প্রায় ১৭ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষের হিসাবে মোট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৬৯ হাজার। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে থাকা ১৭ হাজার ৩৯৪ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। আরও ৫১ হাজার ৬৯৮ জনের আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে ছিল। এর মধ্যে কিছু আবেদন ছাপার পর্যায়ে এবং অনেকের বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হয়েছিল। অর্থাৎ ১৭ হাজারের সংখ্যা মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা নয়; বরং নির্দিষ্ট সময়ে পাসপোর্ট পাওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা।
এই প্রক্রিয়ার শুরু অবশ্য নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নয়। ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সৌদি রাষ্ট্রদূত প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রায় ৬৯ হাজার ব্যক্তির পাসপোর্ট নবায়নের বিষয়টি উত্থাপন করেন। চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারিও সৌদি রাষ্ট্রদূত তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টির অগ্রগতি জানতে চান। পরে ২৮ জানুয়ারি সরকারের পক্ষ থেকে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের কথা উল্লেখ করে পাসপোর্ট নবায়নের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও বিষয়টি গুরুত্ব হারায়নি। গত ২০ এপ্রিল সৌদি রাষ্ট্রদূত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করে কাজটি দ্রুত শেষ করার অনুরোধ জানান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় নথি ও প্রমাণপত্র যাচাই করে প্রায় ২২ হাজার ব্যক্তিকে পাসপোর্ট দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সরকারের বর্তমান অবস্থান হলো, নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী এবং বৈধ বাংলাদেশি নথি থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেই পাসপোর্ট দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তালিকা নিয়ে তা পুনরায় যাচাইয়ের কথাও বলা হয়েছে।
সৌদি আরবের দৃষ্টিতে বিষয়টি মূলত অভিবাসন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত। বৈধ পাসপোর্ট বা ভ্রমণনথি ছাড়া কোনো বিদেশি নাগরিকের দীর্ঘদিন অবস্থান দেশটির প্রশাসনিক ও আইনগত জটিলতা বাড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব আরও বিস্তৃত। কয়েক দশক আগে কেউ ভুল পরিচয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়ে থাকলে এখন সেটি নবায়ন করার মাধ্যমে রাষ্ট্র কি সেই ভুল পরিচয়কে আবার কার্যকর করে তুলছে—প্রশ্নটি সেখানেই।
এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। অতীতে জাল জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্থানীয় প্রত্যয়ন ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দেশেও রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। ফলে সৌদি আরবে থাকা ৬৯ হাজার ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ে শুধু পুরনো পাসপোর্ট বা সৌদি কর্তৃপক্ষের তালিকার ওপর নির্ভর করলে ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি আবেদনকারীর জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পুরনো পাসপোর্ট, বায়োমেট্রিক তথ্য, পুলিশ ও গোয়েন্দা যাচাইসহ সংশ্লিষ্ট নথি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যাদের বাংলাদেশি পরিচয় দেওয়ার পেছনে অনিয়ম ছিল, তাদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও নির্ধারণ করা জরুরি।
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। ফলে দেশটির অনুরোধ পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ সীমিত। কিন্তু শ্রমবাজার রক্ষার কূটনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও নিরাপত্তার নীতি সমন্বয় করাই এখন বড় পরীক্ষা। কারণ রোহিঙ্গারা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী। তাদের বাংলাদেশি পরিচয় আরও বিস্তৃত হলে ভবিষ্যতে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তাই বিষয়টি শুধু ৬৯ হাজার পাসপোর্ট নবায়নের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নথির বিশ্বাসযোগ্যতা, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক, জাতীয় নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কৌশল। অতীতের ভুল যদি যাচাই ছাড়াই নতুন নথিতে পুনরায় বৈধতা পায়, তাহলে তার দায় শুধু বর্তমান সরকারের নয়—ভবিষ্যতের রাষ্ট্রকেও বহন করতে হবে।![]()