নয়াদিল্লি প্রতিনিধি
ভারতের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে কংগ্রেসনেত্রী সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী Belonging: A Journey of Love। বইটি আগামী ১০ নভেম্বর প্রকাশের কথা থাকলেও ভারতীয় সংস্করণের প্রকাশক পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়িয়েছে। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি নিছক সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত, নাকি শাসক বিজেপি সরকারের পরোক্ষ চাপের ফল?
কী ঘটেছে?
প্রথমে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশনা সংস্থা আলফ্রেড এ. নফ বইটি প্রকাশ করবে এবং ভারতে ছাপা ও বিতরণের দায়িত্ব নেবে পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া। প্রাথমিকভাবে এক লাখ কপি ছাপার পরিকল্পনাও ছিল।
কিন্তু দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, ভারতীয় প্রকাশক বইটির কয়েকটি অংশ বাদ দেওয়া ও সম্পাদনার প্রস্তাব দেয়। সোনিয়া গান্ধী সেই প্রস্তাবে সম্মত না হওয়ায় প্রকাশনা প্রক্রিয়া ভেঙে যায়।
পরে এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে পেঙ্গুইন জানায়, তারা ভারতে বইটি প্রকাশ করছে না। তবে তারা দাবি করে, তথ্য যাচাই ও সম্পাদনা–সংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়া ছিল প্রকাশকের স্বাভাবিক দায়িত্ব; বই প্রকাশে তাদের কোনো অনাগ্রহ ছিল না। আলোচনার বিস্তারিত আর প্রকাশ করা হবে না বলেও জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
কেন সন্দেহ তৈরি হয়েছে?
বিতর্কের মূল কারণ হলো—কোন অংশ নিয়ে আপত্তি ছিল, তা প্রকাশ করা হয়নি। সোনিয়া গান্ধীর সমর্থকদের প্রশ্ন, নিজের জীবনের ঘটনা সম্পর্কে একজন লেখকের বর্ণনা প্রকাশক কী ভিত্তিতে সংশোধনের প্রস্তাব দিল?
এই নীরবতার মধ্যেই রাজনৈতিক মহলে ধারণা তৈরি হয়েছে, বইটিতে হয়তো ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস, কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত কিংবা বিজেপি সরকারের সময়কার কিছু সংবেদনশীল প্রসঙ্গ রয়েছে, যা নিয়ে আপত্তি উঠেছে।
তবে এখন পর্যন্ত সরকারের চাপের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিজেপির হস্তক্ষেপের অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে জোরালো হলেও তা এখনও প্রমাণিত নয়।
আগেও এমন হয়েছে?
পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসকে ঘিরে এর আগে কয়েকটি বিতর্ক হয়েছে।
২০২৬ সালের শুরুতে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নরভানের আত্মজীবনী Four Stars of Destiny নিয়ে সংসদে তুমুল বিতর্ক হয়। বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বইটির অপ্রকাশিত অংশ উদ্ধৃত করলে সরকারপক্ষ আপত্তি তোলে। পরে পেঙ্গুইন জানায়, তারা ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেনি।
এর কয়েক মাস পর গ্রাফিক সাংবাদিক জো সাকো–র The Once and Future Riot প্রকাশ থেকেও সরে আসে প্রতিষ্ঠানটি। তখন তাদের যুক্তি ছিল, বইটিতে ভারতের ভুল মানচিত্র ব্যবহৃত হয়েছে।
এই দুই ঘটনার কারণে সমালোচকদের একাংশের ধারণা, বিতর্কিত রাজনৈতিক বিষয় এলে প্রকাশক অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থান নেয়।
এখন কী হতে পারে?
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা হারপারকলিন্স বইটির ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশে আগ্রহী। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি।
নফ বইটিকে বর্ণনা করেছে “ভালোবাসা, পরিবার ও ভারতের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক অন্তরঙ্গ আত্মকথা” হিসেবে। সোনিয়া গান্ধীও বলেছেন, তাঁর পরিবার ও জীবন নিয়ে অনেক লেখা হলেও খুব কমই সত্য ও অনুভূতির কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছে; এই আত্মজীবনী সেই শূন্যতা পূরণ করবে।
মূল প্রশ্নের উত্তর
বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, বিজেপি সরকারের চাপেই বইটি আটকে গেছে—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। যা জানা গেছে তা হলো:
পেঙ্গুইন কিছু অংশ সম্পাদনার প্রস্তাব দিয়েছিল।
সোনিয়া সেই প্রস্তাব মানেননি।
ফলে ভারতীয় প্রকাশনা চুক্তি ভেঙে গেছে।
সরকারের চাপের অভিযোগ রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের আলোচনায় রয়েছে, কিন্তু তার পক্ষে প্রকাশ্য প্রমাণ বা সরকারি স্বীকৃতি নেই।
অতএব, এটি আপাতত একটি অমীমাংসিত প্রকাশনা–বিতর্ক, যেখানে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব—দুই ব্যাখ্যাই আলোচনায় থাকলেও কোনোটিই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।