আতিকুর রহমান রুমনের পেশাগত পরিচয়কে একটি শব্দে আটকে রাখা কঠিন। সাংবাদিক, লেখক, কলামিস্ট, গণমাধ্যম সংগঠক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় একজন ব্যক্তি—সময়ের সঙ্গে এসব পরিচয় তার কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্বে যুক্ত হয়েছে। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে যেমন সংবাদ ও গণমাধ্যমের ভেতরের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত করেছে, তেমনি রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড তাকে নিয়ে গেছে আরও বিস্তৃত এক পরিসরে। ২০২৬ সালে সেই পথচলায় যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
একজন সাংবাদিকের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী কার্যালয়ের যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসা নিঃসন্দেহে পেশাগত জীবনের একটি বড় পরিবর্তন। কারণ সংবাদমাধ্যমে একজন সাংবাদিক যে জায়গা থেকে রাষ্ট্রকে দেখেন, রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের দায়িত্বে এসে তাকে সেই রাষ্ট্রের বক্তব্য, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করতে হয়। একই সঙ্গে সাংবাদিক সমাজের প্রশ্ন, মানুষের প্রত্যাশা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাও পৌঁছে দিতে হয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। রুমনের বর্তমান দায়িত্বের তাৎপর্য তাই শুধু একটি সরকারি পদে নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার দীর্ঘ সাংবাদিকতা-অভিজ্ঞতার একটি নতুন প্রয়োগক্ষেত্র।
বগুড়ার গাবতলী থেকে শুরু
আতিকুর রহমান রুমনের জন্ম ১৯৭৫ সালের ১৫ মে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার পদ্মপাড়া গ্রামে। প্রকাশিত জীবনীসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে বেড়ে ওঠা রুমনের বাবা হাফিজুর রহমান ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী ও সমাজসেবী। মা ফেরদৌসী বেগম ছিলেন গৃহিণী এবং এফএইচ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান। পরিবার ও শৈশবের এই পরিমণ্ডল থেকেই তার শিক্ষাজীবনের সূচনা।
তার শিক্ষাজীবনের সঙ্গে বগুড়ার সরকারি শাহ সুলতান কলেজের নাম বিশেষভাবে যুক্ত। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। অর্থাৎ পেশাগত সাংবাদিকতায় প্রবেশের আগে থেকেই সমাজ ও রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী জীবনে সাংবাদিকতা ও রাজনীতি—দুটি ধারাই তার কর্মপরিসরে সমান্তরালে চলেছে।
উত্তরাঞ্চলের একটি জেলা শহর থেকে সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশের অভিজ্ঞতা তার কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। রাজধানীকেন্দ্রিক সাংবাদিকতার বাইরে জেলা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সংবাদকর্মীদের জন্য যে ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, তার সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ সেই সময়েই তৈরি হয়। পরে গণমাধ্যমের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার মধ্য দিয়ে তার অভিজ্ঞতার পরিধিও বাড়তে থাকে।
সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথ
রুমনের সাংবাদিকতা জীবন কেবল সংবাদ সংগ্রহ বা প্রতিবেদন তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সঙ্গে লেখালেখি, কলাম ও গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা তৈরি হয়। বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাকে সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সাংবাদিকতার সূত্রে তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান সফর করেছেন। প্রকাশিত জীবনীতে যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস, তুরস্ক, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন, চীন, সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানসহ বিভিন্ন দেশ সফরের তথ্য রয়েছে।
বিদেশ সফরের এই অভিজ্ঞতা সাংবাদিকতার কাজের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা তৈরির সুযোগও দিয়েছে। তবে তার কর্মজীবনের মূল কেন্দ্র থেকেছে বাংলাদেশ এবং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা।
সাংবাদিকতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের কথা বলা। সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমে একজন সাংবাদিকের কাজ শুধু ঘটনাকে বর্ণনা করা নয়; ঘটনাটির সামাজিক প্রভাব, মানুষের অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রতিফলনও তুলে ধরা। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করার ফলে রুমনের পেশাগত অভিজ্ঞতার বড় অংশই গড়ে উঠেছে এই জায়গাগুলোকে ঘিরে।
লেখক ও কলামিস্ট হিসেবে পরিচয়
সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখালেখির ক্ষেত্রেও রুমনের পরিচিতি তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাকে একাধিক গ্রন্থের লেখক হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। তার লেখার বিষয়বস্তুর বড় অংশজুড়ে রয়েছে রাজনীতি, রাষ্ট্র, সমাজ ও সমসাময়িক বাংলাদেশ।
কলাম লেখা একজন সাংবাদিকের জন্য ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা। সংবাদ প্রতিবেদনে তথ্য ও ঘটনার নিরপেক্ষ উপস্থাপন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কলামে তেমনি বিশ্লেষণ, যুক্তি ও মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকে। ফলে দীর্ঘদিন সংবাদপেশায় থাকার পাশাপাশি কলাম লেখার অভিজ্ঞতা একজন সাংবাদিককে সমসাময়িক ঘটনাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ দেয়।
রুমনের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকতা ও লেখালেখির এই দুই ধারার পাশাপাশি বিকাশ ঘটেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। ফলে তার পেশাগত জীবন একদিকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করেছে।
রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ড
রুমনের কর্মপরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক এবং বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দলীয় কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তার সম্পৃক্ততার কথাও এসব প্রতিবেদনে এসেছে।
এখানে তার পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়—তিনি একই সময়ে সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাংবাদিকতা ও রাজনীতির এই সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে একজন সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তির সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যম পরিচালনার ভূমিকা একই সঙ্গে থাকলে তার পেশাগত অবস্থান নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়াটাও স্বাভাবিক।
রুমনের কর্মজীবনে এই দ্বৈত পরিচয় দীর্ঘদিন ধরে দৃশ্যমান ছিল। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতা ও লেখালেখি অব্যাহত রেখেছেন। বিভিন্ন মানবিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তার সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে।
দৈনিক দিনকালের সম্পাদক ও প্রকাশক
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি তার কর্মজীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে। ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি দৈনিক দিনকালের সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাকে সাংবাদিক, কলামিস্ট, ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক এবং বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়।
একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্ব সাংবাদিকতার পেশাগত জীবনে আলাদা মাত্রা যোগ করে। এখানে শুধু সংবাদ লেখা বা সম্পাদনা নয়, একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকীয় নীতি, সংবাদ নির্বাচন, প্রকাশনা, সাংবাদিকদের সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়।
রুমনের ক্ষেত্রে দিনকালের সম্পাদক ও প্রকাশক হওয়ার বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে। তিনি আগে থেকেই রাজনৈতিক পরিসরে সক্রিয় ছিলেন। ফলে সম্পাদকীয় দায়িত্বের সঙ্গে তার রাজনৈতিক পরিচয়ও জনপরিসরে আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।
তবে দিনকালের দায়িত্বে তার সময়কাল দীর্ঘ হয়নি। ফেব্রুয়ারির ১৬ তারিখে সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে যোগ দেওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায় ১৮ ফেব্রুয়ারি তাকে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের সরকারি প্রজ্ঞাপনে অন্য পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্ত উল্লেখ করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের নতুন অধ্যায়
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রুমনের পেশাগত জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি আসে। তাকে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নিয়োগটি প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল অথবা প্রধানমন্ত্রীর সন্তুষ্টি সাপেক্ষে—যেটি আগে ঘটে—সেই সময় পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
এই নিয়োগের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের একজন অভিজ্ঞ কর্মী সরাসরি রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্বে আসেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ও অতিরিক্ত প্রেস সচিবের কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, কর্মসূচি ও সরকারি কার্যক্রম সম্পর্কে গণমাধ্যমকে তথ্য দেওয়া এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা।
এই দায়িত্বে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা সরাসরি প্রাসঙ্গিক। একজন সাংবাদিক জানেন সংবাদকক্ষে কোন তথ্যের গুরুত্ব কতটা, কোন তথ্যের ঘাটতি সংবাদকে অসম্পূর্ণ করে এবং কোন ধরনের তথ্য সাংবাদিকদের জন্য প্রয়োজনীয়। আবার মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলে সংবাদকর্মীদের পেশাগত বাস্তবতাও বোঝার সুযোগ থাকে।
রুমনের বর্তমান দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাই রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের মধ্যকার যোগাযোগ। সরকার তার নীতি ও কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে পৌঁছাতে চায়। অন্যদিকে গণমাধ্যম সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করে, তথ্য চায় এবং জনগণের সমস্যাগুলো সামনে আনে। এই দুইয়ের মাঝখানে প্রেস উইং বা রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ কাঠামোর দায়িত্ব হলো তথ্যপ্রবাহকে কার্যকর ও পেশাদার রাখা।
সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ
রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে যাওয়ার পরও রুমনের বক্তব্যে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের প্রসঙ্গ এসেছে। তার সাম্প্রতিক বক্তব্য সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের সঠিক তথ্য পরিবেশন এবং প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার আহ্বানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অপসাংবাদিকতা ও অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার বিষয়েও তিনি কথা বলেছেন।
বর্তমান ডিজিটাল পরিবেশে সংবাদ ও তথ্যের গতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি তথ্য মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে যাচাইহীন তথ্য, গুজব ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যও দ্রুত ছড়ায়। ফলে সরকারি তথ্য যোগাযোগের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্য দ্রুততার পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই রুমনের সাংবাদিকতা-অভিজ্ঞতা কাজে লাগার সুযোগ রয়েছে। একজন সাংবাদিক হিসেবে তিনি জানেন, সংবাদমাধ্যম শুধু সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের জায়গা নয়। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, তথ্য যাচাই করেন এবং একই ঘটনার বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য জানতে চান। রাষ্ট্রীয় যোগাযোগব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে এই পেশাগত বাস্তবতাকে কতটা সম্মান ও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তার ওপর।
মাঠের সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্ক
রুমনের সাংবাদিকতা জীবনের আরেকটি সম্ভাব্য শক্তির জায়গা হলো মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা। রাজধানীকেন্দ্রিক সংবাদ ব্যবস্থার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে কাজ করেন। তাদের অনেকের কাছে তথ্যপ্রাপ্তি, পরিবহন, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও পেশাগত অনিশ্চয়তা প্রতিদিনের বাস্তবতা।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সুযোগ তার রয়েছে। রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ যদি শুধু ঢাকার বড় সংবাদমাধ্যমকে কেন্দ্র করে না থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের কাছেও কার্যকরভাবে পৌঁছে, তাহলে সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের তথ্য আরও বিস্তৃতভাবে মানুষের কাছে যেতে পারে।
একই সঙ্গে মাঠের সাংবাদিকদের সমস্যাও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়। একজন সাংবাদিক থেকে রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের দায়িত্বে আসা রুমনের জন্য এ জায়গাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কমিটিতে দায়িত্ব
২০২৬ সালের জুলাইয়ে রুমনের দায়িত্বের সঙ্গে গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয়। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কমিটি পুনর্গঠন করলে সাংবাদিক প্রতিনিধি হিসেবে ওই কমিটিতে তার নাম রাখা হয়। কমিটির দায়িত্বের মধ্যে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড প্রদান, সংশ্লিষ্ট অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং নীতিমালা পর্যালোচনার বিষয় রয়েছে।
এটি তার বর্তমান রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি ক্ষেত্র। কারণ প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন ব্যবস্থা সাংবাদিকদের পেশাগত পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংবাদ সংগ্রহের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা একজন সদস্যের কাছে সাংবাদিকদের বাস্তবতা ও পেশাগত প্রয়োজন সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা থাকার কথা।
তবে এই ধরনের দায়িত্ব পালনে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে পেশাগত মানদণ্ড ও নীতিমালার প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অ্যাক্রিডিটেশন শুধু একটি কার্ড দেওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশ, সাংবাদিকদের অধিকার, প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা এবং সরকারি তথ্যকেন্দ্রে প্রবেশাধিকারের প্রশ্নও যুক্ত।
পরিচয়ের বদলে দায়িত্বের সময়
রুমনের কর্মজীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তার পরিচয়ের ধারাবাহিক পরিবর্তন। বগুড়ার গাবতলীর ছাত্র থেকে সাংবাদিকতায় প্রবেশ, সেখান থেকে লেখক ও কলামিস্ট হিসেবে পরিচিতি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়তা, একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্ব এবং শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব—এই পথটি কয়েক দশকের কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়কে একসঙ্গে ধারণ করে।
তার এই পথচলায় সাংবাদিকতা একটি স্থায়ী সূত্র। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরও সংবাদমাধ্যম তার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ থেকেছে। আবার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আসার পর সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাই তার নতুন কাজের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
তবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে প্রত্যাশাও বদলে যায়। সাংবাদিক হিসেবে একজন ব্যক্তি নিজের লেখা ও মতামতের মাধ্যমে অবস্থান প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু সরকারের একজন যোগাযোগ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি নীতি এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্ধারিত দায়িত্বের কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে হয়। এই পরিবর্তন তার পেশাগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর।
সাংবাদিকতা থেকে রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ
আতিকুর রহমান রুমনের বর্তমান অবস্থানকে তাই শুধু একজন সাংবাদিকের সরকারি চাকরিতে যোগদান হিসেবে দেখলে তার কর্মজীবনের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ সাংবাদিকতা, লেখালেখি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং গণমাধ্যম পরিচালনার অভিজ্ঞতা।
তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে এই অভিজ্ঞতাগুলোকে রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের কাজে কীভাবে ব্যবহার করা যায়। একজন সাংবাদিকের মতো তথ্যের গুরুত্ব বোঝা, একজন সম্পাদক হিসেবে সংবাদমাধ্যমের চাহিদা বোঝা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের বাস্তবতা কাছ থেকে দেখা—এই তিন অভিজ্ঞতার সমন্বয় তার বর্তমান দায়িত্বকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।
সরকার ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক কখনোই শুধু তথ্য দেওয়ার সম্পর্ক নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রশ্ন, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, জনগণের জানার অধিকার এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ। রাষ্ট্রীয় যোগাযোগব্যবস্থা যত বেশি তথ্যনির্ভর ও পেশাদার হবে, গণমাধ্যমের কাজও তত সহজ হবে।
রুমনের সামনে তাই শুধু সরকারের বক্তব্য গণমাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেই। সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানো, মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীদের বাস্তবতা বোঝা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের মধ্যে পেশাদার যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি করাও তার দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
বগুড়ার পদ্মপাড়া থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত রুমনের যে পথচলা, সেটি দীর্ঘ ও বহুস্তরীয়। ছাত্রজীবনের সাংবাদিকতা থেকে জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যম, লেখালেখি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পেরিয়ে রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের কেন্দ্রে তার বর্তমান অবস্থান—এই যাত্রায় সময়ের সঙ্গে তার দায়িত্বের ধরন বদলেছে বারবার।
এখন তার কর্মজীবনের মূল্যায়নের সবচেয়ে কার্যকর মানদণ্ড হবে বর্তমান দায়িত্বে তার কাজের ধরন। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তিনি কতটা ব্যবহার করতে পারেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে কতটা পেশাদার সম্পর্ক তৈরি করেন, মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের কতটা কাছে পৌঁছান এবং সরকারি তথ্যপ্রবাহকে কতটা কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করা যায়—এসব প্রশ্নই সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আতিকুর রহমান রুমনের জীবনের নতুন অধ্যায় তাই কেবল পদ পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি একজন সাংবাদিকের রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে প্রবেশের গল্প। দীর্ঘ সময় সংবাদমাধ্যমের ভেতর থেকে রাষ্ট্র ও সমাজকে দেখার পর এখন তাকে রাষ্ট্রের ভেতর থেকে সেই যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যেই তার পেশাগত জীবনের সবচেয়ে বড় রূপান্তরটি নিহিত।
সাংবাদিকতার মাঠ থেকে রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের কেন্দ্রে আসা রুমনের সামনে এখন অভিজ্ঞতাকে দায়িত্বে রূপ দেওয়ার সময়। তার দীর্ঘ পেশাগত পথচলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে—সংবাদমাধ্যমকে কতটা বুঝে রাষ্ট্রের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন এবং একই সঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্ন, জনগণের প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনের মধ্যে কতটা কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করতে পারেন।
![]()