নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রযুক্তি ও সেবা পৌঁছে দিতে হবে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সহজলভ্য করা জরুরি। সাধারণ মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে পারলেই তার সাফল্য নিশ্চিত হবে। আর্থিক লেনদেনে নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানুষের ভয় কমিয়ে আনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ডিজিটাল আর্থিক সেবা প্ল্যাটফর্ম ‘জিপে’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ‘জিপেতেই সমাধান’ প্রতিপাদ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্ল্যাটফর্মটির লক্ষ্য আর্থিক লেনদেনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও সবার জন্য সহজলভ্য করা।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল কাদের। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল হাসান। পরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা দলের উপস্থিতিতে জিপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়।
অনুষ্ঠানে জিপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. আহমদ আরমান সিদ্দিকী প্ল্যাটফর্মটির বিভিন্ন সুবিধা ও কার্যক্রম তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সবার জন্য লেনদেনের জটিলতা কমিয়ে আর্থিক কার্যক্রম সহজবোধ্য করাই তাঁদের লক্ষ্য। আর্থিক লেনদেনের বিভিন্ন জটিলতার সমাধান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকেই ‘জিপেতেই সমাধান’ স্লোগানটি নির্ধারণ করা হয়েছে।
দরিদ্র মানুষের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছানোর গুরুত্ব
বক্তব্যে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের শুরুর সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম শুরুর সময় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা এক শাখার সঙ্গে অন্য শাখার যোগাযোগ স্থাপন করাও সহজ ছিল না। সেই পরিস্থিতি থেকে এখন গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, এই পরিবর্তনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
গ্রামীণফোনের যাত্রার প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল গ্রামের দরিদ্র মানুষের কাছে মোবাইল ফোন পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে দরিদ্র নারীদের হাতে ফোন তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে তখন প্রশ্ন উঠেছিল। অনেকে মনে করতেন, ফোনের প্রয়োজন মূলত শহরের মানুষ ও ব্যবসায়ীদের; গ্রামের নারীরা ফোন ব্যবহার করে কী করবেন, তা নিয়েও সংশয় ছিল।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, তিনি তখন বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, ফোন ব্যবহার করতে প্রয়োজনীয় নম্বর শেখা সম্ভব। এর মাধ্যমে গ্রামের নারীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। পাশাপাশি অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করে আয়-উপার্জনের সুযোগও তৈরি করতে পারবেন তাঁরা।
তিনি বলেন, সে সময় বিশ্বজুড়ে বড় শহর ও বড় ব্যবসাকে কেন্দ্র করে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বাড়ছিল। অনেকে মনে করতেন, শহরকেন্দ্রিক ব্যবসাই এ প্রযুক্তির মূল সম্ভাবনা। কিন্তু গ্রামীণফোনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, গ্রামের দরিদ্র মানুষের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছে দিয়েও ব্যবসা সম্প্রসারণ সম্ভব। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বহু কোম্পানি শহরের বাইরেও তাদের ব্যবসা ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
নিরাপদ ও সহজ আর্থিক লেনদেনের ওপর গুরুত্ব
জিপের লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, মানুষকে আর্থিক লেনদেনের ভয় থেকে মুক্তি দেওয়াও এ উদ্যোগের একটি উদ্দেশ্য। নগদ টাকা বহন করার প্রয়োজন কমলে মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বাড়বে। কাগজের নোট বহন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুশ্চিন্তাও কমবে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও সেবার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সাধারণ মানুষের কাছে তা কতটা পৌঁছানো যাচ্ছে তার ওপর। বিত্তবান মানুষের জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকলেও দরিদ্র মানুষের জন্য একই ধরনের সুবিধা সব সময় নিশ্চিত হয় না। তাই দরিদ্র মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রযুক্তি ও সেবা তৈরি করতে হবে।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “বড়লোকের বহু আয়োজন থাকে, কিন্তু গরীবের নেই। গরীবের জন্য যেন প্রযুক্তি থাকে, সার্ভিস থাকে সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রযুক্তি ও সেবা পৌঁছে দিতে হবে।”
সামাজিক ব্যবসা হিসেবে জিপে
গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক দর্শন তুলে ধরে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, গ্রামীণের বিভিন্ন উদ্যোগ সামাজিক ব্যবসার ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সামাজিক ব্যবসার মূল লক্ষ্য মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক সমস্যার সমাধান করা। এ ধরনের ব্যবসায় মুনাফা কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করেন না; বরং অর্জিত মুনাফা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্প্রসারণে ব্যবহার করা হয়।
জিপেকেও একটি সামাজিক ব্যবসা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে অর্জিত মুনাফা প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রসারণে কাজে লাগানো হবে। সামাজিক ব্যবসার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের প্রয়োজন পূরণ এবং আর্থিক সেবার সুযোগ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও প্রতিপাদ্য রয়েছে। তিন শূন্যের পৃথিবী গড়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘টাকা পে’ কার্ড তুলে দেন। এর মধ্য দিয়ে জিপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শেষ হয়।![]()