জুলাই-আগস্টের সেই অগ্নিগর্ভ রাত: শাহাদাত হোসেন শাহীন
শরীয়তপুর থেকে খিলগাঁওয়ের পথে
জুলাই-আগস্টের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা থমথমে আতঙ্ক, আগুনের লেলিহান শিখা আর অনিশ্চয়তার দোলাচল।
ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে তখন গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে ছিলাম। রাত তখন ঠিক ১০টা। কাকা লিয়াকত মঞ্জুর, বন্ধু লিটন আর ছোট ভাইসহ কজন মিলে উঠানে বসে গল্প-আড্ডায় মেতেছিলাম। হঠাৎ ফোন বাজলো। ফোনের ওপাশে ‘দৈনিক যুগান্তর’-এর সিনিয়র রিপোর্টার মোজাম্মেল হক চঞ্চল ভাই।
— “শাহীন ভাই, আপনি কোথায়?”
— “শরীয়তপুরে, ভাই।”
— “আজ রাত ১২টা থেকেই তো কারফিউ জারি করা হচ্ছে! সেনাবাহিনী নেমে যাবে। আপনি যেকোনো উপায়ে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় ফেরার ব্যবস্থা করুন।”
চঞ্চল ভাই জানতেন আমি শরীয়তপুরে আছি, তাই ফোন দিয়ে খবরটি জানানোমাত্রই আড্ডা ছেড়ে উঠে পড়লাম। কালবিলম্ব না করে ড্রাইভার নজির ভাইকে বললাম, “এখনই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে।”
ছোট ভাইকে সাথে নিয়ে শরীয়তপুর থেকে ঢাকার পথে গাড়ি ছুটলো। রাতের শুনশান রাজপথ। আশ্চর্যজনকভাবে পোস্তগোলা ব্রিজ পর্যন্ত পুরো রাস্তায় একটা চলন্ত গাড়ির দেখাও পেলাম না! এক অদ্ভুত ও গা ছমছমে নীরবতা ছড়ানো চারপাশে। ঢাকার ভেতরের প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে ফোন দিলাম খালাতো ভাই জাহিদকে। জাহিদ নিজেও কিছুক্ষণ আগে মোটরসাইকেল নিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে ফিরেছে। সে বললো, “ভাইয়া, যাত্রাবাড়ী দিয়ে আসবেন না। ধোলাইপাড়ের ভেতরের রাস্তা দিয়ে চলে আসেন।”
কিন্তু ছোট ভাইয়ের বাসা মানিকনগর আর আমার বাসা খিলগাঁওয়ের পদ্মকাননে। বাধ্য হয়ে ধোলাইপাড়ের পরামর্শ বাদ দিয়ে হানিফ ফ্লাইওভারের পথই ধরতে হলো। মানিকনগরে ছোট ভাইকে নামিয়ে দিয়ে এগোতেই আসল বিপদের মুখে পড়লাম।
কমলাপুরের কাছাকাছি আসতেই চোখ আঁটকে গেল—রাস্তায় রাস্তায় আগুন জ্বলছে, বাতাসে পোড়া গাড়ির কটু গন্ধ। চারিদিকে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার স্রোত। থমথমে পরিস্থিতি দেখে ড্রাইভার নজির ভাইকে বললাম, “গাড়ি চালিয়ে যাও, থামালেই বিপদ।”
কিন্তু কিছুদূর এগোতেই গাড়ি আটকে দিলো ছাত্র-জনতা।
জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কে?”
বললাম, “আমি সাংবাদিক।” (যদিও গাড়ির সামনেই প্রেস স্টিকার লাগানো ছিল)।
শুনতেই একজন বলে উঠলো, “তাহলে এসব লেখে না কেন? দেশজুড়ে যা ঘটছে তা-ই লিখুন! সাংবাদিকরা সব খারাপ!”
ঠিক তখনই আরেকজন তরুণ এগিয়ে এসে বললো, “আপনার আইডি কার্ডটা একটু দেখি।”
আমি কিছু না বলে শান্তভাবে আমার পিআইডি (PID) কার্ডটি দেখালাম। কার্ডটি দেখে ছেলেটির সুর নরম হলো। সে গম্ভীর গলায় বললো, “এখন থেকে ভালোভাবে রিপোর্ট করবেন। চোখে যা দেখছেন, সত্যটা লিখবেন।”
অবশেষে নানা বাধা পেরিয়ে বাসায় ফিরলাম। মনটা তখন ভীষণ দুঃচিন্তায় ভারী হয়ে আছে—আগামীকাল সকালে দেশের ভাগ্যে কী ঘটতে চলেছে?
এদিকে ড্রাইভার নজির ভাইয়ের বাসা ডেমরায়। গাড়ি গ্যারেজে রেখে তার নিজের পরিবার, স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের কাছে ফেরা দরকার। পরিস্থিতি খারাপ দেখে তাকে সতর্ক করলাম, কিন্তু ডেমরায় ফেরার পথে যাত্রাবাড়ী-কাজের কাজলায় পৌঁছাতেই সে আবার আমাকে ফোন দিল— “বস, হেঁটে যাওয়ার মতোও কোনো জায়গা নেই। চারদিকে শুধু আগুন আর আগুন! ”
নজির ভাই কত যে কষ্ট করে সেদিন রাত আড়াইটার দিকে বাসায় পৌঁছেছিলেন, তা ভাবলেও অবাক লাগে। রাত আড়াইটায় নিরাপদে পৌঁছানোর খবর জানিয়ে ফোন দিয়ে নজির ভাই আকুল কণ্ঠে বললেন, “বস, কাল সকালে কিন্তু ভুল করেও আর বাইরে বের হবেন না!”
সেই রাতটি ছিল জীবনের অন্যতম এক ভয়ঙ্কর কিন্তু সত্য অভিজ্ঞতা। দেশ বদলের ইতিহাস সেদিন যেন আমাদের খুব কাছ থেকে ছুঁয়ে গিয়েছিল।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)![]()