বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন, মামলা-হামলা ও নির্যাতনের মধ্যেও রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ধারাবাহিক সংগ্রামের পরিণতিতেই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পথ তৈরি হয়েছিল। তিনি মনে করেন, আন্দোলনের সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পটভূমিকে বাদ দিয়ে জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করলে পুরো ইতিহাস সামনে আসে না।
সোমবার ২৪ আগস্ট রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির সাবেক মহাসচিব ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের ২৭তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
খন্দকার মোশাররফ বলেন, “অনেকে ২০২৪ সালের আন্দোলনকে শুধু কয়েকজন ব্যক্তির নামে চালাতে চান। তবে দেশের মানুষ মনে করে ২০২৪ সালে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বিএনপির দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলনের ফল। তারই ধারাবাহিকতায় ছাত্র-গণআন্দোলন সফল হয়েছে এবং শেখ হাসিনাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে।”
তিনি বলেন, “বিএনপি দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আরও অনেক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আন্দোলন করেছে। এ সময় বহু নেতাকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মিথ্যা মামলায় আসামি হয়ে শাস্তি ভোগ করেছেন এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও সাজাপ্রাপ্ত হয়ে লন্ডন থেকে দেশে ফিরতে পারেননি।”
বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা তাঁর বক্তব্যে দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সংগ্রামকে সামনে এনে বোঝাতে চান, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগে দেশে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে বহু বছরের আন্দোলন ও বিরোধিতার একটি ধারাবাহিকতা ছিল। তাঁর ভাষায়, বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় ধরে রাজপথে ছিল, কারাবরণ করেছে, মামলার মুখোমুখি হয়েছে এবং নানা ধরনের দমন-পীড়নের মধ্যে থেকেও রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়েছে।
খন্দকার মোশাররফের বক্তব্যের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের রাজনৈতিক ভূমিকার স্মৃতিচারণ। বিএনপির সাবেক এই মহাসচিবকে তিনি কেবল একজন দলীয় সংগঠক হিসেবে নয়, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে সালাম তালুকদার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।” আন্দোলনের সমন্বয়ের জন্য গঠিত লিয়াজোঁ কমিটির আহ্বায়কও ছিলেন তিনি।
সালাম তালুকদারের রাজনৈতিক দৃঢ়তার একটি ঘটনা তুলে ধরতে গিয়ে খন্দকার মোশাররফ সেই সময়ের জামালপুরের একটি জনসভার কথা স্মরণ করেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ওই জনসভায় যোগ দেওয়া নিয়ে দলের ভেতরে উদ্বেগ ছিল। কারণ, এর আগের দিন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ একটি নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং সেই নির্বাচন নিয়ে বক্তব্য দিলে গ্রেপ্তারের হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
খন্দকার মোশাররফ বলেন, “এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় জামালপুরে একটি জনসভায় যাওয়ার কর্মসূচি ছিল। এর আগের দিন এরশাদ একটি নির্বাচনের ঘোষণা দেন এবং ওই নির্বাচনের বিষয়ে বক্তব্য দিলে গ্রেফতারের হুমকি দেওয়া হয়। তখন অনেক নেতা মনে করেছিলেন, জামালপুরের ওই জনসভায় গেলে তাদের গ্রেফতার হতে হবে।”
সে পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া টেলিফোনে সালাম তালুকদারের সঙ্গে কথা বলেছিলেন বলে জানান তিনি। তখন সালাম তালুকদারের অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন খন্দকার মোশাররফ।
তিনি বলেন, “তখন সালাম তালুকদার জানিয়েছিলেন, তিনি এবং তার সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হতে প্রস্তুত। কিন্তু জনসভায় না গেলে তাদের ইজ্জত থাকবে না। শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নেতারা জামালপুরের জনসভায় যোগ দেন।”
জনসভা শেষে ঢাকায় ফেরার পথেও গ্রেপ্তারের আশঙ্কা ছিল। তবে সেই আশঙ্কা সত্ত্বেও আত্মগোপনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নেতারা—এমনটাই স্মরণ করেন খন্দকার মোশাররফ।
তিনি বলেন, “জনসভা শেষে ঢাকায় ফেরার সময় তাদের গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবু খালেদা জিয়া ও সালাম তালুকদার সিদ্ধান্ত নেন, তারা কোথাও আত্মগোপন করবেন না; বরং যার যার বাসায় ফিরে যাবেন। ঢাকায় ফেরার পথে টঙ্গীর কাছে সালাম তালুকদার, ব্যারিস্টার টি এইচ খান, তিনি নিজেসহ অনেক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।”
খন্দকার মোশাররফের মতে, এই ঘটনাটি শুধু একটি গ্রেপ্তারের ঘটনা ছিল না; এর মধ্যে ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থান ও মানসিকতার প্রকাশ। রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে সরে না দাঁড়িয়ে গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নেওয়াকে তিনি আন্দোলনের প্রতি অঙ্গীকারের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “ওই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া ও ব্যারিস্টার সালাম তালুকদারের গণতন্ত্র ও রাজনীতির প্রতি দৃঢ়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে এরশাদবিরোধী আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়।”
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পরবর্তী রাজনৈতিক ফলাফলও স্মরণ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এরশাদের পতনের পর গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিএনপির ভূমিকা আরও শক্তিশালী হয় এবং খালেদা জিয়া জনগণের সমর্থনে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান।
তিনি বলেন, “এরশাদের পতনের পর দেশের জনগণ খালেদা জিয়াকে ‘দেশনেত্রী’ উপাধি দেয় এবং নির্বাচনের মাধ্যমে তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। আন্দোলন সফল করা এবং পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপিকে ক্ষমতায় নেওয়ার সময় দলের মহাসচিব ছিলেন ব্যারিস্টার সালাম তালুকদার।”
সালাম তালুকদারের রাজনৈতিক স্মৃতিচারণের পাশাপাশি খন্দকার মোশাররফের বক্তব্যে ফিরে আসে বিএনপির সাম্প্রতিক আন্দোলনের ইতিহাসও। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে তিনি বিএনপির ১৭ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি পরিণতি হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়ে যে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে, সেখানে বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলনের অবদানকে তিনি সামনে আনতে চান।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ঘটনাকে শুধু ছাত্রদের একটি আন্দোলন কিংবা হঠাৎ সৃষ্ট একটি গণঅভ্যুত্থান হিসেবে দেখলে এর দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বাদ পড়ে যায়। তিনি মনে করেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলন যখন বৃহত্তর গণআন্দোলনে পরিণত হয়, তখন তার পেছনে আগে থেকেই তৈরি থাকা একটি রাজনৈতিক পরিবেশ কাজ করেছে। আর সেই পরিবেশ তৈরিতে বিএনপির দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির ভূমিকা ছিল বলে তাঁর দাবি।
স্মরণসভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে ক্ষমতায় থাকার সময়েও বিএনপির সাংগঠনিক সতর্কতা ও মাঠের উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, “বর্তমানে যারা মন্ত্রী হয়েছেন বা প্রধানমন্ত্রী যাদের নিয়ে কাজ করছেন, তারা কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু রাগ, গোসা বা অভিমান থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হলে এবং দল তা মোকাবিলায় সজাগ না থাকলে পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথে সক্রিয় না থাকলে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদেরও ঝুঁকিতে পড়তে হবে।”
অর্থাৎ, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে বিএনপির মাঠের শক্তি ধরে রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে এমন একটি বার্তা স্পষ্ট, ক্ষমতায় থাকার অর্থ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বরং দলকে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় রাখতে হবে, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখতে হবে এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিকূলতার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।![]()
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নিজের রাজনৈতিক জীবনও বিএনপির কয়েক দশকের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি রাজনীতির পাশাপাশি ভূতত্ত্ববিদ, শিক্ষক, গবেষক ও লেখক হিসেবেও পরিচিত। ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গয়েশপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা খন্দকার আশরাফ আলী এবং মা হোসনে আরা হাসনা হেনা।
দাউদকান্দি হাই স্কুল থেকে ১৯৬২ সালে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। ১৯৬৮ সালে ভূতত্ত্ব বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। ১৯৭০ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে আরেকটি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৭৩ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্ব বিষয়ে পিএইচডি এবং ১৯৭৪ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে ডিআইসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষকতা দিয়েই তাঁর কর্মজীবনের শুরু। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে জুনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। পরে সহকারী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে প্রবাসীদের সংগঠিত করার কাজে যুক্ত হন এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।
রাজনীতিতে তাঁর আনুষ্ঠানিক প্রবেশ ঘটে ১৯৭৯ সালে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। পরে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি, দলের ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও যুগ্ম মহাসচিবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য।
সংসদীয় রাজনীতিতেও তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। কুমিল্লা-২ আসন থেকে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে কুমিল্লা-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দ্বিতীয় হন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে আবার কুমিল্লা-১ আসন থেকে নির্বাচিত হন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৯৬ সালে স্বল্প সময়ের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ছিলেন।
রাজনীতির বাইরে গবেষণা ও লেখালেখিতেও তাঁর আগ্রহ ছিল সক্রিয়। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখা বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধে বিলাত প্রবাসীদের অবদান’, ‘প্লাবন ভূমিতে মৎস্য চাষ, দাউদকান্দি মডেল’, ‘এই সময়ের কিছু কথা’, ‘রাজনীতির হালচাল’, ‘সংসদে কথা বলা যায়’, ‘মূল্যবোধ অবক্ষয়ের খণ্ডচিত্র’, ‘প্রগতি ও সত্যের সন্ধানে’, ‘আমার রাজনীতির রোজনামচা’ এবং ‘মইনুদ্দিন ও ফখরুদ্দিনের ২ বৎসর’।
স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য খাতেও তাঁর আন্তর্জাতিক ভূমিকার উল্লেখ পাওয়া যায়। ২০০২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদের ৫৬তম অধিবেশনে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশে তামাকবিরোধী প্রচারণায় অবদানের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ওয়ার্ল্ড নো টোব্যাকো’ পুরস্কারও পেয়েছেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। ভূতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জীবনী ও প্রকাশনায় তাঁর নাম স্থান পেয়েছে।
নিজ নির্বাচনী এলাকা ও আশপাশের মানুষের জন্যও তিনি বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ নিয়েছেন। শিক্ষা বিস্তার, বেকারত্ব কমানো, স্বাস্থ্যসেবা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার কথা তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। দাউদকান্দি ও আশপাশের এলাকায় তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তবে ২৪ আগস্টের স্মরণসভায় খন্দকার মোশাররফের বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তাঁর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা। একদিকে তিনি ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের মতো পুরোনো নেতাদের আন্দোলনের ইতিহাস সামনে এনেছেন, অন্যদিকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতার মধ্যে বসিয়েছেন।
তিনি বলতে চেয়েছেন, বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তন কোনো একদিনের আন্দোলনে তৈরি হয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, রাজনৈতিক প্রতিরোধ, সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং রাজপথের অভিজ্ঞতা। বিএনপির ১৭ বছরের আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে তিনি সেই ধারাবাহিকতাই খুঁজে পেয়েছেন।
একই সঙ্গে প্রয়াত সালাম তালুকদারের রাজনৈতিক জীবনের উদাহরণ টেনে তিনি বর্তমান বিএনপির জন্যও একটি বার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে যে বিষয়টি বারবার এসেছে তা হলো, আন্দোলনের রাজনীতি শুধু স্লোগান বা কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা, সংগঠনের প্রতি আস্থা এবং রাজনৈতিক অবস্থানে দৃঢ় থাকার সক্ষমতা।
তাই আবদুস সালাম তালুকদারের মৃত্যুবার্ষিকীর এই আয়োজন শুধু একজন সাবেক মহাসচিবের স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ থাকেনি। অনুষ্ঠানের বক্তব্যে বিএনপির অতীত আন্দোলনের ইতিহাস, এরশাদবিরোধী সংগ্রাম, দীর্ঘ ১৭ বছরের বিরোধী রাজনীতি এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—সবকিছুকে একই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় দেখানোর চেষ্টা হয়েছে।
খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বক্তব্যে সবচেয়ে স্পষ্ট যে দাবিটি সামনে এসেছে, তা হলো—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পেছনে বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি বড় ভূমিকা ছিল এবং সেই ভূমিকা উপেক্ষা করলে আন্দোলনের পূর্ণ ইতিহাস পাওয়া যাবে না। আর গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বক্তব্যে এসেছে, ক্ষমতায় থেকেও বিএনপিকে রাজপথ ও সংগঠন—দুই জায়গাতেই সক্রিয় থাকতে হবে।
পুরোনো আন্দোলনের স্মৃতি আর বর্তমান রাজনীতির হিসাব—দুইকে পাশাপাশি রেখে স্মরণসভায় বিএনপির অভিজ্ঞ নেতারা মূলত দলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েই কথা বলেছেন। সেখানে বারবার ফিরে এসেছে আন্দোলনের ইতিহাস, ত্যাগের কথা এবং রাজনৈতিকভাবে সজাগ থাকার প্রয়োজনীয়তা।![]()