‘ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড থাকলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণ পাওয়া সহজ হবে’
মো. মাহীয়ুল ইসলাম
উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও হেড অব রিটেইল ব্যাংকিং, ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি
রাজু আলীম
বাংলাদেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় ‘এক দেশ, এক কিউআর’ উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। একটি কিউআর কোডের মাধ্যমে সব ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) থেকে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ী ও গ্রাহক—উভয়ের জন্যই লেনদেন আরও সহজ হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এটি শুধু পেমেন্ট গ্রহণের মাধ্যম নয়, ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ এবং সহজে ঋণ পাওয়ারও একটি কার্যকর ভিত্তি তৈরি করবে বলে মনে করেন ব্র্যাক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও হেড অব রিটেইল ব্যাংকিং মো. মাহীয়ুল ইসলাম। তিনি বলেন, ডিজিটাল লেনদেনের নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি হলে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতা মূল্যায়ন করে সহজেই ঋণ দিতে পারবে। সম্প্রতি সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলা কিউআরের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ এবং ব্র্যাক ব্যাংকের প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলেন।
মাহীয়ুল ইসলামের মতে, বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দেশের লাখো ছোট দোকান, মুদি ব্যবসায়ী, ফার্মেসি, হকার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার অধিকাংশ লেনদেন এখনো নগদনির্ভর। ফলে তাদের ব্যবসার প্রকৃত পরিমাণ বা আয় সম্পর্কে ব্যাংকের কাছে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য থাকে না। এ কারণে প্রয়োজনীয় মূলধন থাকা সত্ত্বেও অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংকঋণ থেকে বঞ্চিত হন।
তিনি বলেন, বাংলা কিউআরের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেন ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত হবে। ফলে ব্যবসায়ীর বিক্রি, আয় এবং নগদ প্রবাহের একটি নির্ভরযোগ্য রেকর্ড তৈরি হবে। এই তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যাংক সহজেই তার ব্যবসার সক্ষমতা মূল্যায়ন করতে পারবে। ফলে জামানত বা প্রচলিত কাগজপত্রের ওপর নির্ভরতা কমে বাস্তব ব্যবসার ভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার সুযোগ বাড়বে।
তার ভাষায়, ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাসই ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক পরিচয় হয়ে উঠবে। এটি শুধু ঋণ পাওয়ার সুযোগই বাড়াবে না, বরং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে তাদের আরও শক্তভাবে যুক্ত করবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলা কিউআর ব্যবহার করলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন অনেক সমস্যারও সমাধান হবে। জাল নোট, ছেঁড়া নোট কিংবা খুচরা টাকা না থাকার কারণে যে ধরনের বিড়ম্বনা ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, ডিজিটাল পেমেন্টে তার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে দোকানে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ রাখার প্রয়োজন কমে যাওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকিও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করতে শক্তিশালী প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব তুলে ধরে মাহীয়ুল ইসলাম বলেন, একটি সফল ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন এমন একটি অ্যাপ, যা সহজ, দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারে। এ লক্ষ্যেই ব্র্যাক ব্যাংক অনেক আগেই ‘আস্থা’ অ্যাপ চালু করেছে এবং ধারাবাহিকভাবে এর সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে।
তিনি জানান, বর্তমানে আস্থা অ্যাপের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হচ্ছে। বাংলা কিউআর চালুর পর অ্যাপটিকে আরও আধুনিক ও ব্যবহারবান্ধব করে তোলার কাজ চলছে, যাতে গ্রাহকরা যে কোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সহজেই কিউআর স্ক্যানের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন।
ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলা কিউআরের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে মোট আর্থিক লেনদেনের ৭৫ শতাংশ ক্যাশলেস ব্যবস্থায় নিয়ে আসা। সেই লক্ষ্য অর্জনে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ এটি একই প্ল্যাটফর্মে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ক্ষুদ্র দোকান, বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠান—সবাইকে যুক্ত করেছে।
তিনি বলেন, আগে একজন গ্রাহককে নির্দিষ্ট ব্যাংক বা এমএফএসের কিউআর কোড খুঁজতে হতো। এখন একটি বাংলা কিউআর স্ক্যান করেই যে কোনো অংশগ্রহণকারী ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ থেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করা যাচ্ছে। এতে গ্রাহকের সময় যেমন বাঁচছে, তেমনি ডিজিটাল লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ছে।
তবে খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাংলা কিউআর আরও বিস্তৃত করতে এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন মাহীয়ুল ইসলাম। তিনি বলেন, অনেক ছোট ব্যবসায়ীর এখনো কোনো ব্যাংক হিসাব বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট নেই। আবার অনেকেই ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফি বা চার্জের কারণে এই পদ্ধতি গ্রহণে আগ্রহী হন না।
তার মতে, এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে নীতিগত প্রণোদনা এবং ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকেও ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন সুবিধা দিতে হবে।
তিনি জানান, ব্র্যাক ব্যাংক ইতোমধ্যে বাংলা কিউআর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের জন্য বেশ কয়েকটি সুবিধা চালু করেছে। গ্রাহক পেমেন্ট করার সঙ্গে সঙ্গে অর্থ ব্যবসায়ীর হিসাবে জমা হচ্ছে। পাশাপাশি ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে পেমেন্ট করলে গ্রাহকদের রিওয়ার্ড পয়েন্ট দেওয়া হচ্ছে। এসব পয়েন্ট ব্যবহার করে কার্ডের বার্ষিক ফি মওকুফসহ বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া সাধারণ গ্রাহকদের জন্যও আস্থা অ্যাপের মাধ্যমে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে সহজে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে মাহীয়ুল ইসলাম বলেন, প্রযুক্তির সুবিধা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে সাইবার প্রতারণার ঝুঁকিও। তাই গ্রাহকদের সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই।
তিনি পরামর্শ দেন, কিউআর স্ক্যান করার পর পিন বা ওটিপি দেওয়ার আগে অবশ্যই মার্চেন্টের নাম এবং পরিশোধযোগ্য অর্থের পরিমাণ ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নিজের পিন, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। সামান্য অসতর্কতাই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
মাহীয়ুল ইসলামের মতে, বাংলা কিউআর কেবল একটি নতুন পেমেন্ট প্রযুক্তি নয়; এটি দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও দ্বার খুলে দেবে। ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে ব্যবসার তথ্যভান্ডার তৈরি হলে ব্যাংকিং সেবা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ হবে এবং দেশের ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব