নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়নের জন্য নিয়মকানুন থাকলেও বাস্তবে তা মানার প্রবণতা কম। নাগরিক থেকে আবাসন প্রতিষ্ঠান, এমনকি নগর পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্তরাও নিজেদের স্বার্থে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে। এর ফলে জলাশয় ও খোলা জায়গা দখল, নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ এবং অপরিকল্পিত আবাসন গড়ে উঠছে। ঢাকায় বাড়ছে জনসংখ্যার চাপ। জমির স্বল্পতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে নগরজীবনও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেছেন, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ করলেই হবে না। আবাসন, পরিবহন, জ্বালানি ও নাগরিক সেবাকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা করতে হবে। কোথায় কী ধরনের উন্নয়ন হবে, তা নির্ধারণ করে জোনিংয়ের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে নগরায়ণ করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, মহাপরিকল্পনা ছাড়া উন্নয়ন কার্যক্রম অনেকটা লক্ষ্য ঠিক না করে তীর ছোড়ার মতো। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া একটি শহর বা অঞ্চলকে কাঙ্ক্ষিতভাবে উন্নত করা সম্ভব নয়। এ কারণে সরকার প্রথমবারের মতো ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় মেট্রোপলিটন সিটি থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মাস্টারপ্ল্যান করা হবে।
তিনি বলেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আরবান ডেভেলপমেন্ট ডাইরেক্টরেটকে (ইউডিডি) শক্তিশালী করা হচ্ছে। এ বিভাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করা হবে। পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। সর্বশেষ যে শুমারি হয়েছে, সেটিও অনেকদিন আগের। তাই নতুন করে সঠিক ও হালনাগাদ শুমারি করা প্রয়োজন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে নগর উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হবে।
জাকারিয়া তাহের বলেন, দেশের নগরায়ণ প্রক্রিয়ায় আইন ও পরিকল্পনার ব্যত্যয় বড় সমস্যা তৈরি করছে। কোথায় আবাসিক এলাকা হবে, কোথায় বাণিজ্যিক বা শিল্পাঞ্চল হবে, কোথায় জলাশয় ও খোলা জায়গা সংরক্ষণ করতে হবে—এসব বিষয় পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে উন্নয়ন হলে একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি হয়, অন্যদিকে নগরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, ঢাকার ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমাতে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখলে চলবে না। দেশের অন্যান্য শহর ও আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। কর্মসংস্থান, আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহনসহ নাগরিক সেবার সুযোগ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে পারলে ঢাকামুখী মানুষের চাপও কমানো সম্ভব হবে।
মন্ত্রী বলেন, স্মার্ট আবাসন মানে শুধু আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবন নির্মাণ নয়। মানুষের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা, নিরাপদ পরিবহন, জ্বালানি ব্যবস্থা, পরিবেশ ও অবকাঠামোর সমন্বিত পরিকল্পনা থাকতে হবে। একটি ভবন কোথায় নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে মানুষ কীভাবে যাতায়াত করবে, পানি ও জ্বালানির ব্যবহার কীভাবে কমানো যাবে এবং ভবিষ্যতে ওই এলাকার ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি হবে—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই আবাসন পরিকল্পনা করতে হবে।
তিনি বলেন, টেকসই নগরায়ণের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতকে একই কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে হবে। আবাসন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা ও আইন মেনে চলার পাশাপাশি পরিবেশগত বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিতে হবে। জলাশয়, খোলা জায়গা ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
জাকারিয়া তাহের আরো বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। একই সঙ্গে সবুজ ও সাশ্রয়ী আবাসন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহ এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এসব উদ্যোগ নগরবাসীর জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর পাশাপাশি শহরের ওপর পরিবেশগত চাপও কমাবে।
তিনি বলেন, নগর উন্নয়নে শুধু অবকাঠামো নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিলে হবে না। উন্নয়নকে মানুষের জীবনমানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একটি বাসযোগ্য শহরের জন্য পরিকল্পিত আবাসন, কার্যকর গণপরিবহন, পর্যাপ্ত খোলা জায়গা, নিরাপদ সড়ক, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিরবচ্ছিন্ন নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
মন্ত্রী বলেন, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। একই এলাকায় একাধিক সংস্থা ভিন্ন ভিন্নভাবে কাজ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তাই নগর উন্নয়নের প্রতিটি পর্যায়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, নগর উন্নয়নে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইন প্রয়োগেও কঠোর হতে হবে। অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ, জলাশয় ভরাট কিংবা পরিকল্পনার বাইরে আবাসন গড়ে তোলার সুযোগ রাখা যাবে না। একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিক, আবাসন প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন খাতসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নগর পরিকল্পনার নিয়ম মেনে চলতে হবে।
জাকারিয়া তাহের বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নও আরো টেকসই হবে। একটি সুপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও নাগরিক জীবন—সবকিছুর জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে। তাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।![]()