সাবিনা সোমা
১৯৭৭ সালে, প্রিন্সেস ডায়ানার বয়স মাত্র ১৬ বছর, তখন চার্লসের সাথে তাঁর প্রথম দেখা হয়।
মজার ব্যাপার হলো, চার্লস তখন ডায়ানার বড় বোন সারা স্পেন্সারের সাথে ডেট করছিলেন!
চার্লস যখন স্পেন্সারদের এস্টেটে যান, তখন প্রথম ডায়ানাকে দেখেন।
পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে একটি উইকএন্ড পার্টিতে তাঁদের আবার দেখা হয়।
চার্লস ততদিনে ৩০ পার করেছেন এবং রাজপরিবারের ওপর চাপ ছিল তাঁর জন্য একজন উপযুক্ত, তরুণী এবং অভিজাত পাত্রী খোঁজার।
১৯ বছরের মিষ্টি, লাজুক ডায়ানাকে চার্লসের বেশ পছন্দ হয়, আর ডায়ানাও চার্লসের প্রেমে পড়ে যান।
১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁদের বাগদানের ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে বাগদানের পরপরই নেওয়া একটি টিভি ইন্টারভিউতে বিচ্ছেদের প্রথম সংকেত পাওয়া গিয়েছিলো।
সংবাদদাতা প্রশ্ন করেছিলেো, আপনারা কি প্রেমে পড়েছেন?
ডায়ানা হেসে উত্তর দিয়েছিলো, অবশ্যই!
কিন্তু চার্লস ঠান্ডা গলায় উত্তর দেন, Whatever ‘in love’ means!
(ভালোবাসা বলতে যা বোঝায় আর কি!)
ডায়ানা পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন, চার্লসের এই উত্তরটি শুনে তাঁর মন ভেঙে গিয়েছিলো।
১৯৮১ সালের ২৯ জুলাই লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালে তাঁদের রাজকীয় বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৫ কোটি মানুষ টিভিতে এই রয়েল ওয়েডিং দেখেছিলেন।
রাজকুমার আর রাজকুমারীর এই বিয়েকে তৎকালীন মিডিয়া “The Wedding of the Century” বা শতাব্দীর সেরা রূপকথা বলে অভিহিত করে।
বিয়ের পর ডায়ানা জন্ম দেন দুই সন্তান। প্রিন্স উইলিয়াম এবং প্রিন্স হ্যারি।
ডায়ানা তাঁর এই দুই ছেলেকে অবিশ্বাস্য রকমের ভালোবাসতেন। রাজপরিবারের শতবছরের প্রথা ও নিয়ম ভেঙে তিনি চেয়েছিলেন তাঁর সন্তানরা যেন আর দশটা সাধারণ শিশুর মতো বড় হয়।
তিনি ছেলেদের রাজপ্রাসাদের চার দেয়ালের বাইরে নিয়ে গিয়ে ফাস্টফুড খাওয়াতেন, অ্যামিউজমেন্ট পার্কে ঘুরতে নিয়ে যেতেন, এমনকি সাধারণ মানুষের কষ্ট বোঝানোর জন্য গৃহহীনদের আশ্রয়কেন্দ্রেও নিয়ে যেতেন।
বিয়ের পর ডায়ানা খুব দ্রুতই বুঝতে পারলেন চার্লসের হৃদয় আগেই দখল করে রেখেছিলেন ক্যামিলা পারকার বোলেস নামে এক বিবাহিত নারী।
চার্লস বিয়ের আগেও ক্যামিলাকে ভালোবাসতেন, কিন্তু রাজপরিবারের আপত্তির কারণে তখন তাঁকে বিয়ে করতে পারেননি। বিয়ের পর চার্লস ডায়ানার সাথে সংসার করলেও গোপনে ক্যামিলার সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।
ডায়ানা চার্লসকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলেন, কিন্তু প্রতিদানে পেয়েছেন কেবল অবহেলা আর দূরত্ব।
ডায়ানা পরবর্তীতে তাঁর বিখ্যাত বিবিসি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,
Well, there were three of us in this marriage, so it was a bit crowded.
(আমাদের এই সংসারে আসলে আমরা তিনজন ছিলাম, তাই একটু হিজিবিজি হয়ে গিয়েছিলো।)
স্বামীর অবহেলা, রাজপ্রাসাদের কড়া সামাজিক নিয়ম এবং গণমাধ্যমের চরম তাড়া খেয়ে ডায়ানা ভীষণ একা হয়ে পড়েন। তিনি চরম ডিপ্রেশন এবং ‘বুলেমিয়া’ যা এক ধরনের মানসিক ও শারীরিক খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগে ভুগতে শুরু করেন।
১৯৯২ সালে চার্লস ও ডায়ানা আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৯৫ সালে ডায়ানা বিবিসির ‘প্যানোরামা’ ইন্টারভিউতে চার্লসের পরকীয়া ও রাজপরিবারের নির্মমতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেন।
১৯৯৬ সালে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের হস্তক্ষেপে অবশেষে চার্লস ও ডায়ানার অফিশিয়াল ডিভোর্স সম্পন্ন হয়।
বিয়ে বিচ্ছেদের মাত্র এক বছর পর, ১৯৯৭ সালে প্যারিসে এক মর্মান্তিক গাড়ি দুর্ঘটনায় ডায়ানা মা/ রা যান।
পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা যিনি পেয়েছিলেন, নিজের জীবনে তিনি যাকে ভালোবাসতে চেয়েছিলেন, তার মন পাননি।
বিশ্বজোড়া ভালোবাসা পেয়েও নিজের কাছের মানুষের কাছ থেকে একটুখানি খাঁটি ভালোবাসা পাননি, তাঁর এই পরিণতি আজও বিশ্ববাসীকে ব্যথিত করে।