নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্ধ হয়ে যাওয়া বা বন্ধের উপক্রম হওয়া প্রায় ২০০ শিল্প-কারখানা পুনরায় চালু করা গেলে প্রায় ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে এসব কারখানা পুনরুজ্জীবিত হলে শিল্প উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংক খাতে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ ঋণও পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসে গতকাল অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় উপস্থাপিত একটি কনসেপ্ট পেপারে এ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। ‘এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য: চট্টগ্রাম অঞ্চলের সম্ভাবনা’ শীর্ষক এ সভায় বলা হয়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্প-কারখানাগুলোয় বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংক খাতের প্রায় এক লাখ কোটি টাকার খেলাপি ও অবাণিজ্যিক ঋণ জড়িয়ে আছে।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসের নির্বাহী পরিচালক মো. হানিফ মিয়ার সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ এবং প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম।
কনসেপ্ট পেপারে বলা হয়, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। জাতীয় অর্থনীতিতে দেশের মোট রফতানির ১৮ শতাংশ, আমদানির ২১ শতাংশ এবং রেমিট্যান্সের ২৮ শতাংশ এ অঞ্চল থেকে আসে। দেশের মোট আমানতের ১৯ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং মোট ঋণের ১৮ দশমিক ৫ শতাংশও চট্টগ্রাম অঞ্চলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে এ অঞ্চলের শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা শুধু স্থানীয় অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, এর প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতেও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কনসেপ্ট পেপারে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামষ্টিক অর্থনীতি, শিল্পায়ন এবং ব্যাংক খাতের প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি সেগুলো দূর করার একটি রূপরেখাও তুলে ধরা হয়। এতে বন্ধ শিল্প-কারখানাগুলো পুনরায় চালু করাকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমানোর অন্যতম সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
তবে বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় বাধার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সংকট, দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির অভাব এবং দক্ষ পরিচালনাকারী বা অপারেটরের ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, শুধু ঋণ পুনঃতফসিল বা নতুন করে অর্থায়ন করলেই এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান টেকসইভাবে চালু করা সম্ভব হবে না। কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা, বাজার সম্ভাবনা, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং উদ্যোক্তার সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সভায় গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান আঞ্চলিক অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি এসএমই ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর পাশাপাশি ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ব্লু-ইকোনমি, সামুদ্রিক সম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ম্যানমেড ফাইবার খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন গভর্নর। এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে উদ্যোগী হওয়ার নির্দেশনাও দেন তিনি।
গভর্নর বলেন, চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুধু বিদ্যমান শিল্পকে টিকিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও তৈরি করতে হবে। এ জন্য ব্যাংকিং খাতকে উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়াতে হবে এবং উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
প্রবাসী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন গভর্নর। তিনি বলেন, অদক্ষ শ্রমিক বিদেশে পাঠানোর পরিবর্তে বিদেশের শ্রমবাজারে নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের প্রশিক্ষিত করে পাঠাতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সভায় ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণ এবং ক্যাশলেস বাংলাদেশ গঠনের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। গভর্নর বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ানো এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, আর্থিক সেবার আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি লেনদেন ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে পারলে আঞ্চলিক অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে।
ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকার বিষয়েও স্পষ্ট অবস্থান জানান গভর্নর। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খাতে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না।’
ব্যাংকের অনিয়মের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শকদের অনিয়মের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করে পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্ধ শিল্প-কারখানার সঙ্গে ব্যাংক খাতের বিপুল পরিমাণ ঋণ আটকে থাকার বিষয়টি এ উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রায় এক লাখ কোটি টাকার খেলাপি ও অবাণিজ্যিক ঋণের বিপরীতে ২০০ কারখানা পুনরায় চালু করা গেলে একদিকে যেমন শিল্প উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে এসব ঋণের একটি অংশ পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কোন প্রতিষ্ঠান বাস্তবে পুনরায় চালু করার মতো অবস্থায় রয়েছে এবং কোনগুলো কাঠামোগতভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে—তা পৃথকভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন, ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন, নতুন বিনিয়োগকারী আনা এবং প্রয়োজনীয় কার্যকরী মূলধন সরবরাহের মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর এবং যাদের পুনরায় চালুর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নেই, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ সভায় বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপে থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য আঞ্চলিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম আরও বাড়াতে হবে।
তিনি আর্থিক ও আয়বৈষম্য কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং মানুষের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের পেছনে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বড় একটি কারণ। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল, রফতানি ও আমদানি কার্যক্রম এবং প্রবাসী আয়ের সঙ্গে এ অঞ্চলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে চট্টগ্রামের শিল্প খাতের পুনরুদ্ধার হলে তার প্রভাব দেশের সামগ্রিক উৎপাদন, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও ব্যাংকিং কার্যক্রমে পড়তে পারে।
তবে ২০০ কারখানা চালু করে ১০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য বাস্তবায়নে শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। কারখানাভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, সম্ভাব্যতা যাচাই, অর্থায়নের ধরন নির্ধারণ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরনো অনিয়মের পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সে বিষয়েও নজরদারি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কনসেপ্ট পেপারে চট্টগ্রামকে ঘিরে যে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা গেলে বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনের পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের একটি বড় ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম শুধু দেশের বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার হিসেবেই নয়, আগামী দিনে কর্মসংস্থান ও শিল্প পুনরুদ্ধারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবেও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।