বাংলা কিউআর ডিজিটাল লেনদেনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে: ফয়সাল রহমান
ফয়সাল রহমান
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
প্রাইম ব্যাংক পিএলসি
রাজু আলীম
বাংলাদেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সহজ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর করতে ‘এক দেশ, এক কিউআর’ বা বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন প্রাইম ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল রহমান। তার মতে, একটি সমন্বিত ও আন্তঃকার্যক্ষম পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম শুধু নগদ অর্থের ব্যবহার কমাবে না, বরং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজলভ্য করে তুলবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় কমবে, বাড়বে সেবার দক্ষতা এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
ফয়সাল রহমান বলেন, বাংলা কিউআরের মতো একটি ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট ব্যবস্থা ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও গতিশীল, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতার নিজস্ব কিউআর ব্যবহারের কারণে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। একজন ব্যবসায়ীকে একাধিক কিউআর কোড ব্যবহার করতে হতো, আবার গ্রাহকদেরও কোন অ্যাপ বা কোন ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা যাবে, তা নিয়ে বিভ্রান্ত হতে হতো। বাংলা কিউআর সেই সীমাবদ্ধতার অবসান ঘটিয়েছে। এখন একটি কিউআর কোডের মাধ্যমেই অংশগ্রহণকারী যেকোনো ব্যাংক বা পেমেন্ট সেবার গ্রাহক সহজে লেনদেন করতে পারবেন।
তিনি জানান, এই জাতীয় উদ্যোগ সফল করতে প্রাইম ব্যাংক প্রযুক্তি, অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং গ্রাহকসেবাসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। ব্যাংকটি বিশ্বাস করে, ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ঘটাতে শুধু প্রযুক্তি উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; গ্রাহকের আস্থা অর্জন এবং ব্যবহারকে সহজ করে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলা কিউআরের ফলে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমও আরও দক্ষ ও ব্যয়-সাশ্রয়ী হবে বলে মনে করেন ফয়সাল রহমান। তিনি বলেন, আগে প্রতিটি ব্যাংক বা পেমেন্ট সেবাদাতাকে আলাদা আলাদা কিউআর অবকাঠামো পরিচালনা করতে হতো। এখন একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মার্চেন্ট অনবোর্ডিং, পেমেন্ট গ্রহণ এবং সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন অনেক সহজ হবে। এতে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় কমবে, একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের জন্যও ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সহজ হয়ে উঠবে।
ডিজিটাল পেমেন্টকে জনপ্রিয় করতে প্রাইম ব্যাংক ইতোমধ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ফয়সাল রহমান জানান, দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংকটি ডিজিটাল ব্যাংকিংকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘মাইপ্রাইম’ অ্যাপ, কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট সুবিধা এবং ‘প্রাইম পে’-এর মতো আধুনিক ডিজিটাল সেবা চালু করেছে। এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এখন বাংলা কিউআরকেও গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই ডিজিটাল লেনদেন বাড়বে না। এজন্য গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই প্রাইম ব্যাংক বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করছে। সহজ মার্চেন্ট অনবোর্ডিং, ডিজিটাল পেমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ প্রচারণা এবং গ্রাহকদের হাতে-কলমে ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে উৎসাহিত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেন আরও সম্প্রসারণের জন্য ক্যাশব্যাক, মার্চেন্ট রিওয়ার্ড, বিশেষ মূল্যছাড় এবং বিভিন্ন প্রণোদনামূলক কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্ভাবনার পাশাপাশি এর নিরাপত্তা নিয়েও গুরুত্বারোপ করেন ফয়সাল রহমান। তিনি বলেন, যে কোনো ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার মতো বাংলা কিউআরেও কিছু ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে সাইবার জালিয়াতি, ফিশিং, ভুয়া কিউআর কোড কিংবা ব্যবহারকারীর অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটতে পারে। তবে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, উন্নত অথেনটিকেশন, সার্বক্ষণিক মনিটরিং এবং গ্রাহকদের সচেতনতার মাধ্যমে এসব ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি জানান, প্রাইম ব্যাংক প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। ব্যাংকের মাইপ্রাইম অ্যাপসহ সব ডিজিটাল সেবায় আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রতারণা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং জালিয়াতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের সচেতন করতে নিয়মিত প্রচারণাও চালানো হচ্ছে, যাতে তারা ভুয়া কিউআর, প্রতারণামূলক লিংক কিংবা ফিশিংয়ের মতো ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে পারেন।
বাংলাদেশকে পুরোপুরি ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু একটি প্রযুক্তি চালু করলেই হবে না বলেও মন্তব্য করেন ফয়সাল রহমান। তার মতে, এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো, কার্যকর ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট ব্যবস্থা, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, সময়োপযোগী নীতিমালা এবং সর্বোপরি মানুষের মধ্যে ডিজিটাল আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
তিনি বলেন, এই রূপান্তরের জন্য সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, ফিনটেক প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট এবং সাধারণ গ্রাহক—সব পক্ষের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি দ্রুত বাড়বে এবং নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক অর্থনীতিতে রূপান্তর আরও ত্বরান্বিত হবে।
ফয়সাল রহমানের বিশ্বাস, বাংলা কিউআর শুধু একটি নতুন পেমেন্ট পদ্ধতি নয়; এটি দেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। একটি একীভূত, নিরাপদ ও সহজ পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে গ্রাহক, ব্যবসায়ী এবং ব্যাংক—সব পক্ষই উপকৃত হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, ব্যয় হ্রাস এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও জোরদার হবে। তার মতে, এভাবেই বাংলা কিউআর বাংলাদেশের ক্যাশলেস অর্থনীতি গঠনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব