সুশীল কুমার দাস
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, রানু অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড
সৈয়দপুর রেলবাজারের ছোট একটি টিনের দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন সুশীল কুমার দাস। পুঁজি ছিল সীমিত, কিন্তু ব্যবসা নিয়ে ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর মা রানু। মায়ের স্বপ্নকে সামনে রেখে স্ত্রী প্রয়াত শ্যামলী রানী দাসকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন শ্যামলী সিটি গ্রুপ। পরে উত্তরবঙ্গের পাটের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ২০১০ সালে সৈয়দপুরের কামারপুকুর ইউনিয়নের কলাবাগান এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন রানু অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
টিনের ব্যবসা থেকে পাটশিল্পে আসার সেই উদ্যোগ এখন বড় পরিসরের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। রানু অ্যাগ্রোর তৈরি পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগ ও অন্যান্য পাটপণ্য এখন জাপান, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির পাটপণ্য রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। রপ্তানির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে।
সৈয়দপুরের এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিস্তারের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। পাটচাষি, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, সরবরাহকারী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী—অনেকেই যুক্ত হয়েছেন এই শিল্পের সঙ্গে। ফলে উত্তরবঙ্গের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে পাটকে ঘিরে নতুন বাজার তৈরি হয়েছে।
সুশীল কুমার দাসের ব্যবসায়িক যাত্রার শুরু হয়েছিল সৈয়দপুর রেলবাজারে। সাধারণ একটি দোকানে টিন বিক্রি করতেন তিনি। ১৯৮৮ সাল থেকে নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর শিল্পোদ্যোগের ভিত্তি তৈরি করে। ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু প্রচলিত বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি; নতুন পণ্য, নতুন বাজার এবং উৎপাদনমুখী শিল্পে বিনিয়োগের পথ খুঁজেছেন।
তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন স্ত্রী শ্যামলী রানী দাস। শ্যামলীর নামে গড়ে ওঠা শ্যামলী সিটি গ্রুপের মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শ্যামলী রানী দাস এখন প্রয়াত। তবে তাঁর স্বপ্নকে সামনে রেখেই ব্যবসার বিস্তার ঘটাচ্ছেন সুশীল কুমার দাস।
মায়ের অনুপ্রেরণায় শুরু হওয়া এই যাত্রায় পাটকে বেছে নেওয়ার পেছনেও ছিল উত্তরবঙ্গের বাস্তবতা। তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উর্বর জমিতে দীর্ঘদিন ধরে পাট চাষ হয়ে আসছে। একসময় সৈয়দপুর ছিল উত্তরবঙ্গের পাট বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। রেল যোগাযোগের কারণে এ অঞ্চলের পাট সহজে দেশের অন্যান্য অঞ্চল ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত হতো। সময়ের সঙ্গে সেই বাজারব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লেও পাটের কাঁচামালের সম্ভাবনা রয়ে যায়।
সুশীল কুমার দাস সেই সম্ভাবনাকেই শিল্পে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ২০১০ সালে রানু অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের যাত্রা শুরু হয়। শুরু থেকেই তিনি পণ্যের মান, উৎপাদন প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার ওপর গুরুত্ব দেন। স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ না থেকে রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই এর ফল পাওয়া যায়। ২০১৩ সালে রানু অ্যাগ্রো প্রথমবারের মতো ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। এরপর ধীরে ধীরে রপ্তানি বাজার বিস্তৃত হতে থাকে। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির পণ্য ১২টি দেশে রপ্তানি হয়। পরবর্তী কয়েক বছরে নতুন নতুন বাজার যুক্ত হতে থাকে। ২০২৫ সালে রপ্তানি আয় প্রায় ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পাটপণ্য যাচ্ছে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। জাপান, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, তুরস্ক, উগান্ডা, তানজানিয়া, নাইজেরিয়া, গাম্বিয়া ও ঘানাসহ প্রায় ৩০টি দেশের ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
পাটপণ্যের বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা এখন শুধু দামের ওপর নির্ভর করে না। পরিবেশগত মান, খাদ্য নিরাপত্তা, পণ্যের স্থায়িত্ব এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ার মানও ক্রেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্লাস্টিক ও অন্যান্য কৃত্রিম প্যাকেজিংয়ের বিকল্প হিসেবে পাটের পণ্যের চাহিদা বাড়ার সুযোগটিই কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে রানু অ্যাগ্রো।
প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় বিভিন্ন ধরনের পাটের ব্যাগ তৈরি হয়। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন মানের স্ট্যান্ডার্ড ও ফুড-গ্রেড ব্যাগ। বিনোলা টুইল, লাইট সিস, এ/বি/এল টুইল এবং ডাবল ওয়ার্প বা ডি ডব্লিউ ব্যাগও তৈরি করা হয়।
এই ব্যাগগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো পচনশীল। প্রায় ১০০ কেজি পর্যন্ত পণ্য বহনের উপযোগী এসব ব্যাগ খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য পরিবহনে ব্যবহার করা যায়। চাল, গম, কফি, কোকোসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য প্যাকেজিংয়ের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে এ ধরনের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে।
খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। রানু অ্যাগ্রোর দাবি, তাদের ফুড-গ্রেড ব্যাগ আন্তর্জাতিক বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করা হয় এবং খাদ্যপণ্য সুরক্ষায় হাইড্রো-কার্বনমুক্ত উৎপাদনপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।
পণ্যের মান ধরে রাখতে উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। হেমেড মাউথ ও ওভারহেড ড্রাই সিউন প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা হয় ব্যাগগুলো। পাটের স্বাভাবিক শক্তি ধরে রেখে এগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী করার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের রং ও নকশায় পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। ফলে প্রচলিত পাটের বস্তার বাইরে আধুনিক প্যাকেজিং পণ্য হিসেবেও এসব ব্যাগের বাজার তৈরি হয়েছে।
রানু অ্যাগ্রোর সাফল্যের আরেকটি দিক হলো স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান। কারখানায় উৎপাদন, প্যাকেজিং, পরিবহন, প্রশাসন ও অন্যান্য কাজে বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সাত হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
পাটশিল্পের সঙ্গে কৃষকদের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পকারখানায় কাঁচামালের চাহিদা থাকলে কৃষকের উৎপাদিত পাটের বাজার তৈরি হয়। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের কৃষকদের জন্য স্থানীয়ভাবে বড় ক্রেতা তৈরি হওয়া পাটের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখে। এ কারণে সৈয়দপুরে একটি বড় পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠাকে শুধু শিল্প স্থাপনের ঘটনা হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা; এর সঙ্গে স্থানীয় কৃষি ও কর্মসংস্থানেরও যোগ রয়েছে।
সুশীল কুমার দাসের ব্যবসায়িক বিস্তার অবশ্য শুধু পাটশিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। পুরোনো টিনের ব্যবসার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি পরে শ্যামলী সিমেন্ট শিট মিলস লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটিতে সিমেন্ট ও অন্যান্য উপাদানের সমন্বয়ে রঙিন ঢেউটিন তৈরি করা হচ্ছে। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি এসব পণ্য ভারতেও রপ্তানি হচ্ছে।
শ্যামলী সিটি গ্রুপের অধীনে বর্তমানে শ্যামলী সিমেন্ট শিট মিলস, শ্যামলী রুফিং শিট, সিটি ইস্পাত ও মেসার্স সিটি ট্রেডার্সসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসায় ১৯৮৮ সাল থেকে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকেই এসব প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটেছে।
তবে সুশীল কুমার দাসের কাছে পাটশিল্পের সম্ভাবনা আলাদা। কারণ এই শিল্পে দেশের কৃষি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি—তিনটি খাতেরই সংযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশ চাইলে পাটের বহুমুখী ব্যবহার ও মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে এ বাজারের বড় অংশ নিতে পারে।
রানু অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুশীল কুমার দাস বলেন, ‘সরকার যদি শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে, তাহলে কারখানার উৎপাদন বর্তমানের চেয়ে বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলো যদি দেশীয় পণ্যের নতুন বাজার তৈরিতে উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করে, তাহলে পাটপণ্যের রপ্তানি অন্তত ১০ গুণ বাড়ানো সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন বাজার তৈরি হলে শিল্পের প্রসার হবে, বেকারত্ব কমবে। মানুষের হাতে অর্থ থাকলে দেশের অর্থনীতিও আরও গতিশীল হবে।’
সুশীল কুমার দাসের ব্যবসায়িক যাত্রার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—স্থানীয় বাণিজ্য থেকে উৎপাদন এবং উৎপাদন থেকে রপ্তানিমুখী শিল্পে যাওয়ার পথটি দীর্ঘ হলেও অসম্ভব নয়। সৈয়দপুর রেলবাজারের একটি ছোট টিনের দোকান থেকে শুরু করে আজ প্রায় ৩০টি দেশের বাজারে পাটপণ্য পাঠানো সেই পরিবর্তনেরই উদাহরণ।
একসময় উত্তরবঙ্গের পাট রেলপথ ধরে দেশের বাইরে যেত। এখন সেই পাট স্থানীয় কারখানায় প্রক্রিয়াজাত হয়ে নতুন পণ্যে রূপ নিয়ে আবার আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে। পার্থক্য শুধু পণ্যের ধরনে নয়; বদলেছে মূল্য সংযোজনের পরিসরও। কাঁচা পাটের বদলে তৈরি হচ্ছে খাদ্যপ্যাকেজিংয়ের ব্যাগ, যা বিদেশি ক্রেতার কাছে সরাসরি বিক্রি হচ্ছে।
সুশীল কুমার দাসের উদ্যোগ তাই শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাফল্যের গল্প নয়। এটি উত্তরবঙ্গের কৃষি, স্থানীয় উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি—এই চারটি ধারাকে একই ব্যবসায়িক কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করার একটি উদাহরণ। পাটের কাঁচামাল উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্পপণ্য তৈরি এবং তা বিদেশে বিক্রি—পুরো মূল্যশৃঙ্খলকে স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী করতে পারলে উত্তরবঙ্গের শিল্প অর্থনীতিতে আরও বড় পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
রানু অ্যাগ্রোর সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখা এবং নতুন বাজারে প্রবেশ করা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয়, প্রযুক্তি উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং বিদেশি বাজারে বিপণন—সবগুলো বিষয়ই রপ্তানি বাড়ানোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এসব ক্ষেত্রে নীতিগত সহায়তা ও অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়লে বাংলাদেশের পাটপণ্যের জন্য আরও বড় বাজার তৈরি হতে পারে।
সৈয়দপুরের সেই ছোট টিনের দোকান থেকে শুরু হওয়া ব্যবসার আজকের অবস্থান দেখায়, স্থানীয় সম্পদ ও অভিজ্ঞতাকে আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে উত্তরবঙ্গ থেকেও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। মায়ের স্বপ্নকে সামনে রেখে সুশীল কুমার দাস যে উদ্যোগ শুরু করেছিলেন, সেটি এখন প্রায় ৩০টি দেশের বাজারে বাংলাদেশের পাটপণ্যের পরিচয় বহন করছে।![]()