রবীন্দ্র-নজরুলের সুরে শিকড়ের সন্ধান, পঞ্চম রবীন্দ্র-নজরুলসংগীত উৎসব
রাজু আলীম
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দুটি নাম বারবার ফিরে আসে—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। একজনের হাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পেয়েছে বিশ্বজনীনতার মহিমা, অন্যজনের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে সাম্য, বিদ্রোহ ও মানবমুক্তির গান। তাঁদের সৃষ্টি কেবল সাহিত্য বা সংগীতের সম্পদ নয়; বরং বাঙালির আত্মপরিচয়, মানবিক মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম ভিত্তি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ, রাজনীতি ও প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু এই দুই কবির প্রাসঙ্গিকতা কমেনি। বরং নতুন বাস্তবতায় তাঁদের চিন্তা ও দর্শনের প্রয়োজনীয়তা আরও গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে।
এই উপলব্ধি থেকেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুই দিনব্যাপী পঞ্চম রবীন্দ্র-নজরুলসংগীত উৎসব। আজ বুধবার শুরু হয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে এই আয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; বরং নতুন প্রজন্মকে তাদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করার এক সচেতন প্রয়াস।
![]()
উৎসবের প্রথম দিন উৎসর্গ করা হয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এবং দ্বিতীয় দিন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। দুই দিনের কর্মসূচিতে রয়েছে গান, গীতিনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’, নজরুলের লেটো পালা এবং দুই কবির গানের বিভিন্ন ধারার উপস্থাপনা। প্রেম, প্রকৃতি, পূজা, দেশাত্মবোধ, মানবতা, সাম্য ও প্রতিবাদের মতো বিষয়গুলো সংগীত ও মঞ্চনির্ভর পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হবে।
বাংলাদেশে রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলসংগীতের চর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক একটি উৎসবের মাধ্যমে দুই কবির সৃষ্টির এমন সমন্বিত উপস্থাপনা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। সে কারণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আয়োজন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এতে অংশ নিচ্ছেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিল্পীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগ, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির সংগীত বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় এবং নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ উৎসবটিকে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত করেছে।
এই আয়োজনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে একই সূত্রে দেখার প্রয়াস। বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁরা দুই ভিন্ন ধারা সৃষ্টি করলেও তাঁদের মূল দর্শন মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার প্রশ্নে এসে মিলিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ মানুষকে শিখিয়েছেন মানবতা, সহমর্মিতা ও বিশ্বনাগরিকত্বের বোধ। অন্যদিকে নজরুল শিখিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সাম্যের দর্শন। এই দুই ধারার মিলনেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম ভিত্তি।
বর্তমান সময়ে এই চেতনার প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানুষ আগের চেয়ে দ্রুত তথ্য পাচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অসহিষ্ণুতা এবং মূল্যবোধের সংকট। এমন সময়ে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য ও সংগীত কেবল শিল্পের আনন্দ দেয় না; মানুষকে চিনতে, সমাজকে বুঝতে এবং মানবিক হতে শেখায়। তাঁদের রচনায় রয়েছে ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক, স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধ, প্রেম ও প্রতিবাদ, সৌন্দর্য ও সত্যের অনুসন্ধান।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এমন উৎসব আয়োজনের আরেকটি গুরুত্ব রয়েছে শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক বিকাশের ক্ষেত্রে। উচ্চশিক্ষা কেবল পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জায়গা নয়; এটি মানুষের চিন্তা, রুচি ও মূল্যবোধ গঠনেরও ক্ষেত্র। একজন শিক্ষার্থী যখন রবীন্দ্রনাথের গান পরিবেশন করেন বা নজরুলের সাম্যের গান গেয়ে মঞ্চে ওঠেন, তখন তিনি শুধু একটি সুর পরিবেশন করেন না; বরং একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করেন।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রবীন্দ্র ও নজরুলচর্চা নতুন গতি পেয়েছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্পীরা নিয়মিতভাবে তাঁদের সাহিত্য ও সংগীত নিয়ে কাজ করছেন। চলতি বছরকে ‘নজরুলবর্ষ’ হিসেবে উদযাপনের উদ্যোগও সেই চর্চাকে আরও বিস্তৃত করেছে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংগীত ও চারুকলার চর্চা বাড়ানোর বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংস্কৃতিবিদদের মতে, সৃজনশীল ও মানবিক সমাজ গঠনে শিল্প-সংস্কৃতির বিকল্প নেই।
সমকালীন সংগীতাঙ্গনও বর্তমানে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল মাধ্যম শিল্পীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন একজন শিল্পী খুব সহজেই দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং স্ট্রিমিং সেবার মাধ্যমে সংগীতের বিস্তার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজ হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বেড়েছে প্রতিযোগিতা এবং শুদ্ধ সংগীতচর্চা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও।
এই বাস্তবতায় রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলসংগীতের মতো ধ্রুপদি ধারার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ এই ধারাগুলো কেবল বিনোদন নয়; এগুলো ভাষার সৌন্দর্য, কাব্যিকতা, সুরের শৃঙ্খলা এবং চিন্তার গভীরতার শিক্ষাও দেয়। নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করানো মানে কেবল কিছু গান শেখানো নয়; বরং তাদের একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও নন্দনতাত্ত্বিক বোধের সঙ্গে যুক্ত করা।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ছায়ানট, নজরুল ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এই চর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংগীত বিভাগও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উৎসব সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। এখানে প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর ক্ষেত্র তৈরি করছে।
উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অসাম্প্রদায়িক চেতনার পুনরুচ্চারণ। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতে ধর্মীয় সহাবস্থান, মানবিকতা এবং সামাজিক সম্প্রীতির যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁদের রচনায় মানুষ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কোনো বিভাজন নেই; আছে পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানের আহ্বান। বর্তমান সময়ে যখন নানা কারণে বিভাজনের আলোচনা সামনে আসে, তখন এই দুই কবির দর্শন সমাজকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বরাবরই সাংস্কৃতিক জাগরণের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পেছনে শিক্ষাঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আজও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চার অন্যতম ক্ষেত্র। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম রবীন্দ্র-নজরুলসংগীত উৎসব সেই দায়িত্ববোধেরই একটি প্রতিফলন।
দুই দিনের এই আয়োজন শেষ হয়ে যাবে নির্ধারিত সময়ে। মঞ্চের আলো নিভবে, গান থামবে, দর্শক ফিরে যাবেন নিজেদের ব্যস্ত জীবনে। কিন্তু যদি এই উৎসব একজন তরুণকে রবীন্দ্রনাথের একটি গান নতুন করে শুনতে অনুপ্রাণিত করে, যদি একজন শিক্ষার্থী নজরুলের কোনো কবিতা হাতে তুলে নেয়, যদি কারও মধ্যে মানবতা, সাম্য এবং সংস্কৃতিবোধের নতুন উপলব্ধি জন্ম দেয়, তবে সেই প্রভাব দুই দিনের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাবে।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল কেবল অতীতের দুই মহাকবি নন; তাঁরা এখনও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আত্মার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের সৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে আছে মানবতার শিক্ষা, সৌন্দর্যের বোধ, প্রতিবাদের শক্তি এবং সহাবস্থানের স্বপ্ন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম রবীন্দ্র-নজরুলসংগীত উৎসব সেই স্বপ্নকেই নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি আন্তরিক সাংস্কৃতিক প্রয়াস।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব