চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জীবনকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর পথটি যেন তার জন্য শুরু থেকেই তৈরি ছিল। জন্মেছিলেন এমন এক পরিবারে, যেখানে রাজনীতি ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ। বাবা ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা এবং একসময় উপ-প্রধানমন্ত্রী। ফলে শৈশব থেকেই শি ছিলেন চীনের রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির সন্তান—যাদের বলা হয় ‘প্রিন্সলিং’ বা ‘রাজপুত্র’।
কিন্তু শি জিনপিংয়ের গল্প কেবল সুবিধা পাওয়া এক রাজনৈতিক পরিবারের সন্তানের গল্প নয়। তার জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। যে পরিবার তাকে ক্ষমতার কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল, রাজনৈতিক ঝড় সেই পরিবারকেই একসময় ছিটকে দিয়েছিল। শৈশবের নিরাপদ ও সুবিধাজনক জীবন বদলে যায় অপমান, অনিশ্চয়তা এবং কঠিন বাস্তবতায়। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক।
শি জিনপিং জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৩ সালে বেইজিংয়ে। তার বাবা শি ঝংজুন ছিলেন চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রজন্মের একজন নেতা। গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার আগে ও পরে কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রীও হন। ফলে শি পরিবারের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান ছিল অন্য অনেক পরিবারের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা।
শি ছিলেন তার বাবার ষষ্ঠ সন্তান। বেইজিংয়ের রাজনৈতিক অভিজাত পরিবেশে বেড়ে ওঠায় ছোটবেলা থেকেই তিনি রাষ্ট্র, দল ও রাজনীতির ভেতরের জগতের সঙ্গে পরিচিত হন। ভালো স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছেই ছিল তার বেড়ে ওঠা।
কিন্তু চীনের রাজনীতি তখন স্থির ছিল না। বিশেষ করে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বাধীন সাংস্কৃতিক বিপ্লব দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে আমূল বদলে দেয়। এই সময় শি পরিবারের ওপরও নেমে আসে রাজনৈতিক বিপর্যয়।
তার বাবা শি ঝংজুন রাজনৈতিকভাবে নিগৃহীত হন। পরিবারের জন্য সেটি ছিল এক গভীর সংকট। যে শিশুটি একসময় বেইজিংয়ের অভিজাত পরিবেশে বেড়ে উঠছিল, তাকে খুব অল্প বয়সেই চীনের গ্রামীণ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।
কৈশোরে শি জিনপিংকে শানসি প্রদেশের একটি গ্রামীণ এলাকায় পাঠানো হয়। সেখানে তিনি কৃষকদের সঙ্গে বসবাস করেন এবং কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের জীবনযাপন করেন। মাটির গুহাবাড়িতে থাকার অভিজ্ঞতাও তার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। পরবর্তী জীবনে শি বহুবার এই সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তার রাজনৈতিক দর্শনে সাধারণ মানুষের জীবন, দারিদ্র্য এবং গ্রামীণ চীনের অভিজ্ঞতার যে ছাপ দেখা যায়, তার শিকড় এই সময়ের মধ্যে খুঁজে পান অনেকে।
একসময় যে ছেলেটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে বড় হচ্ছিল, তাকে তখন নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়েছিল প্রায় শূন্য থেকে। এখানেই শি জিনপিংয়ের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর একটি।
গ্রামে থাকার সময়ই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেন। প্রথমদিকে তার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। পরে তিনি পার্টিতে যোগ দেন। ধীরে ধীরে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হন।
২২ বছর বয়সে তিনি চিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসায়নিক প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। চীনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন তার ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল না; বরং এখান থেকেই তিনি আবার পার্টির সাংগঠনিক রাজনীতিতে আরও গভীরভাবে প্রবেশ করেন।
স্নাতক শেষ করার পর শি জিনপিং বেইজিংয়ে স্থায়ী না থেকে স্থানীয় পর্যায়ের প্রশাসনে কাজ করার পথ বেছে নেন। তার রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ কেটেছে চীনের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রদেশগুলোতে। ফুজিয়ান প্রদেশে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর তিনি ঝেজিয়াংয়ে দায়িত্ব পালন করেন।
এই দুই অঞ্চল পরবর্তী সময়ে চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৯৮০-এর দশকে দেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্মুক্ততার নীতি শুরু হওয়ার পর উপকূলীয় প্রদেশগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্পায়ন দ্রুত বাড়তে থাকে।
শি জিনপিং এই পরিবর্তনকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি শিল্প, বিনিয়োগ, কৃষি, অবকাঠামো এবং প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন। জাতীয় রাজনীতির বড় মঞ্চে ওঠার আগে কয়েক দশক ধরে স্থানীয় প্রশাসনের ভেতরে কাজ করার এই অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এ সময়েই তিনি এমন এক রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেন, যা পরবর্তী সময়ে তার ক্ষমতার কেন্দ্রে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় পর্যায়ে যাদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন, তাদের অনেকেই পরে চীনের প্রশাসন ও কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে আসেন।
ব্যক্তিজীবনেও এই সময় ছিল নানা পরিবর্তনের। ১৯৭৯ সালে শি জিনপিং প্রথমবার বিয়ে করেন কে লিংলিংকে। তিনি যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত চীনের সাবেক রাষ্ট্রদূতের মেয়ে ছিলেন। তবে সেই দাম্পত্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রায় তিন বছরের মধ্যেই তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
এরপর শি জিনপিংয়ের জীবনে আসেন পেং লিউয়ান। তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এক পারস্পরিক বন্ধু। পেং তখন চীনের সামরিক বাহিনীর একজন জনপ্রিয় লোকসংগীত শিল্পী। তিনি শুধু সামরিক বাহিনীর মধ্যেই পরিচিত ছিলেন না; চীনের সাধারণ মানুষের কাছেও তার বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল।
প্রতি বছর চীনের চান্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে প্রচারিত বিশেষ টেলিভিশন অনুষ্ঠান কোটি কোটি মানুষ দেখত। সেই অনুষ্ঠানে নিয়মিত গান গাইতেন পেং লিউয়ান। ফলে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে অনেক চীনা নাগরিকের কাছে পেং ছিলেন তার স্বামী শি জিনপিংয়ের চেয়েও বেশি পরিচিত মুখ।
শি তখনও জাতীয় পর্যায়ের পরিচিত রাজনৈতিক নেতা নন। তিনি ছিলেন প্রাদেশিক পর্যায়ের কর্মকর্তা। অন্যদিকে পেং ছিলেন দেশজুড়ে পরিচিত সাংস্কৃতিক তারকা। তাদের দাম্পত্য তাই চীনা জনজীবনে এক ধরনের আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছিল।
তাদের একমাত্র সন্তান শি মিংজে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৯২ সালে। পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তবে চীনের রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হয়েও তার ব্যক্তিগত জীবন অত্যন্ত গোপনীয় রাখা হয়েছে। চীনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শীর্ষ নেতাদের পরিবারের ব্যক্তিগত জীবন সাধারণত ব্যাপকভাবে প্রকাশ করা হয় না, আর শি মিংজের ক্ষেত্রেও সেই গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে।
এদিকে শি জিনপিংয়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিল। তার অগ্রগতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি এক লাফে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসেননি। বরং কয়েক দশক ধরে স্থানীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ে কাজ করে ধাপে ধাপে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন।
ফুজিয়ান থেকে ঝেজিয়াং, সেখান থেকে সাংহাই—প্রতিটি পদই তাকে চীনের ক্ষমতার কাঠামোর আরও কাছে নিয়ে যায়।
২০০৭ সালে সাংহাইয়ের দলীয় প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকাল ছিল খুব সংক্ষিপ্ত। কিন্তু ওই পদটি তার ক্যারিয়ারের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংহাই ছিল চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রগুলোর একটি। সেখানে দায়িত্ব পালনের পরই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা পলিটব্যুরো স্থায়ী কমিটিতে প্রবেশ করেন।
সেই সময় থেকেই পরিষ্কার হতে শুরু করে, শি জিনপিং শুধু আরেকজন প্রাদেশিক নেতা নন। তিনি চীনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অন্যতম সম্ভাব্য মুখ।
পাঁচ বছর পর, ২০১২ সালে, সেই সম্ভাবনা বাস্তবে পরিণত হয়। হু জিনতাওয়ের উত্তরসূরি হিসেবে শি জিনপিং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। পরের বছর তিনি চীনের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন।
এরপর চীনের রাজনীতি বদলাতে শুরু করে।
শি ক্ষমতায় আসার সময় চীন ইতোমধ্যেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। কয়েক দশকের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেশটিকে বৈশ্বিক শক্তির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে চীনের সামনে ছিল দুর্নীতি, আঞ্চলিক বৈষম্য, পরিবেশগত সংকট, দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মতো বড় চ্যালেঞ্জ।
শি জিনপিং এসব সমস্যার মোকাবিলায় শুধু অর্থনৈতিক নীতিতে পরিবর্তন আনেননি; তিনি চীনের রাজনৈতিক কাঠামোকেও আরও কেন্দ্রীভূত করেছেন।
তার নেতৃত্বের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি ছিল দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। ক্ষমতায় আসার পর তিনি দলের ভেতরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করেন। শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে স্থানীয় নেতা—অনেকেই এই অভিযানের আওতায় আসেন। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল পার্টির শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। সমালোচকদের মতে, এই অভিযান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বল করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
শি একই সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃত্বকে রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী করেছেন। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, সামরিক বাহিনী এবং পররাষ্ট্রনীতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্রমেই তার নেতৃত্বের চারপাশে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
তার নেতৃত্বে চীন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মতো বৃহৎ আন্তর্জাতিক অবকাঠামো ও বিনিয়োগ কর্মসূচির মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বাড়িয়েছে।
একই সময়ে চীনের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতা চীনের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে।
দেশের ভেতরেও শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তি খাতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি, আবাসন ও আর্থিক খাতের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা—সবকিছু মিলিয়ে তার শাসনব্যবস্থা আগের কয়েক দশকের চীনের তুলনায় ভিন্ন চরিত্র ধারণ করেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি এসেছে তার নিজের ক্ষমতার ক্ষেত্রেই। ২০১৮ সালে চীনের প্রেসিডেন্টের জন্য দুই মেয়াদের সাংবিধানিক সীমা তুলে দেওয়া হয়। এর ফলে শি জিনপিং দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার পথ তৈরি করেন।
চীনের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি ছিল একটি বড় পরিবর্তন। কারণ দেং শিয়াওপিংয়ের পর চীনের নেতৃত্বে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ ও নির্দিষ্ট মেয়াদি হস্তান্তরের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, শির আমলে সেটি বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়ে।
আজকের শি জিনপিং তাই শুধু চীনের প্রেসিডেন্ট নন। তিনি একই সঙ্গে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের চেয়ারম্যান। ফলে দলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং সামরিক নেতৃত্ব—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার কেন্দ্রই তার হাতে কেন্দ্রীভূত।
তার উত্থানের গল্প তাই শুধু একজন রাজনীতিকের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর গল্প নয়। এটি চীনের গত অর্ধশতকের রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও এক প্রতিচ্ছবি।
একসময় রাজনৈতিকভাবে নিগৃহীত বাবার সন্তান হিসেবে ক্ষমতার সুবিধা হারিয়েছিলেন যে কিশোর, গ্রামে কঠোর জীবন কাটিয়েছিলেন যে তরুণ, স্থানীয় প্রশাসনের ছোট পদ থেকে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন যে কর্মকর্তা—সেই শি জিনপিংই কয়েক দশক পর বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রের সর্বময় নেতা হয়ে ওঠেন।
এই পথটি ছিল সরল নয়। জন্মসূত্রে পাওয়া সুবিধা তাকে শুরু করার জায়গা দিয়েছিল, কিন্তু সাংস্কৃতিক বিপ্লব সেই সুবিধার বড় অংশ কেড়ে নেয়। গ্রামীণ জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে অন্য বাস্তবতার মুখোমুখি করে। স্থানীয় প্রশাসনের দীর্ঘ ক্যারিয়ার তাকে ধীরে ধীরে পার্টির সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতরে শক্ত অবস্থান তৈরি করার সুযোগ দেয়। আর জাতীয় নেতৃত্বে ওঠার পর তিনি চীনকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে শুরু করেন, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য—সবকিছুকেই প্রভাবিত করেছে।
তাই শি জিনপিংকে বোঝার জন্য শুধু আজকের চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকে দেখা যথেষ্ট নয়। তাকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় সেই ছেলেটির কাছে, যে জন্মেছিল ক্ষমতাবান একটি পরিবারে, খুব অল্প বয়সেই সেই ক্ষমতার পতন দেখেছিল এবং পরে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ করেছিল।
সেই অর্থে শি জিনপিংয়ের গল্প চীনের ‘রাজপুত্র’ হয়ে ওঠার গল্পের চেয়ে বেশি—এটি একজন রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীর পুনর্গঠনের গল্প। যে উত্তরাধিকার একসময় প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল, পরে সেটিই তাকে নিয়ে যায় চীনের ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে।![]()