ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
শেখ হাসিনা দেশে ফিরে গণহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের দায় নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হোন এবং কারাগারে যান—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে ঝিনাইদহের শৈলকূপায় এক মতবিনিময় ও স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। আমিও বিশ্বাস করতে চাই, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরে গণহত্যার দায় নিয়ে কারাগারে যাবেন এবং আইনি পথ ধরে হাঁটবেন। আইনের ক্ষমতা অনেক দীর্ঘ। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সম্পর্কে তার বলার একটাই কথা—বাংলাদেশে খুন, গুম ও গণহত্যার মতো গুরুতর অভিযোগের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এসব অভিযোগ ও ঘটনার সত্যতার মুখোমুখি হতে হলে তাকে দেশে ফিরতে হবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে তিনি বাংলাদেশকে খুন করেননি, আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে তিনি খুন, গুম, গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। সেই সব সত্যের মুখোমুখি যদি তিনি হতে চান, তাহলে অবশ্যই তিনি আসবেন।’
শেখ হাসিনাকে জুলাই বিপ্লবসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের মামলায় অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে উল্লেখ করে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, যারা বলছেন তিনি ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেবেন, তিনি ভিডিও কনফারেন্সে আসেননি। একটি অডিও রেকর্ডেড কনফারেন্সে পাঠিয়েছেন। অনেকে বলছেন, সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। তিনি দেশে ফিরে আসুন কিংবা কনফারেন্সে আসুন—তার কাছে শেখ হাসিনা একজন ফেরারি আসামি।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘উনি একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। উনি আমার এখানে সাড়ে ৪ হাজার মানুষকে ক্রসফায়ারে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত আসামি। উনি আমার কাছে জুলাই বিপ্লবে ১৪শ’ মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করার মামলার আসামি। উনি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।’
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে যারা বেশি আলোচনা করছেন, তাদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, এতগুলো অভিযোগ ও অপরাধের পর শেখ হাসিনা কখনো জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন কি না, সেটিও ভাবতে হবে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, একবারের জন্যও শেখ হাসিনার মনে হয়েছে কি না যে তার সরকার কোনো অপরাধ করেছে।
বিচার বিভাগের সংস্কার ও জনগণের আস্থা প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, তার স্বপ্নের বিচার বিভাগ এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে একজন দরিদ্র ও অসহায় মানুষও মনে করবেন, সৃষ্টিকর্তার পরেই এই জায়গায় গেলে তিনি আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারেন। তবে বিচার বিভাগে এখনো অনেক সমস্যা রয়েছে।
তিনি বলেন, বিচার বিভাগ নিয়ে মানুষের কাছে সমস্যার ধরন একরকম, তার কাছে আরেক রকম। কেউ মনে করেন বিচার বিভাগ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে, কেউ বলেন টাউট-বাটপারে ভরে গেছে, আবার কেউ বলেন প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। তবে তার কাছে বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় সংকট হলো মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন বিচারকের অভাব।
আইনমন্ত্রী বলেন, কেউ যদি বিচারক হিসেবে পেশা বেছে নেন, তাহলে তাকে মনে রাখতে হবে এটি অন্য দশটি চাকরির মতো সাধারণ কোনো পেশা নয়। বিচারকদের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব রয়েছে এবং তাদের বিধাতা প্রদত্ত সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হয়।
তিনি বলেন, ‘আমি যদি বিচারককে পেশা হিসেবে বেছে নিই, তাহলে আমাকে ধরে নিতে হবে আমি আর দশটা চাকরির মতোই চাকরি করতে আসছি। বিচারকদের মনে রাখতে হবে, আমি এখানে এসেছি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য, বিধাতা প্রদত্ত সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করার জন্য।’
মতবিনিময় ও প্রয়াত বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের স্মরণসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন, পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশীষ বিন হাছান, শৈলকূপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান এবং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন বাবর ফিরোজ।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।