সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থা আবারও ফিরতে শুরু করেছে। কার্যক্রম শুরুর পর গ্রাহকদের বড় অংশ আমানত ফেরতের আবেদন করলেও চাহিদার পুরো অর্থ তুলে নিচ্ছেন না। বরং অর্থ ফেরতের সুযোগ চালুর পরও ব্যাংকে নতুন করে আমানত জমা পড়ছে। এতে একীভূত পাঁচ ব্যাংক নিয়ে গঠিত নতুন ব্যাংকটির সামনে থাকা প্রথম বড় পরীক্ষা—আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার—এখন পর্যন্ত প্রত্যাশার তুলনায় ইতিবাচকভাবেই এগোচ্ছে।
গত ১ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে মোট ৫ হাজার ৫১১ কোটি টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করেছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৭৭ আমানতকারী। এর বিপরীতে অর্থ তুলেছেন ৩৫ হাজার ৯০৭ জন, মোট ১ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ আবেদন করা অর্থের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এখনো ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হয়নি। আমানত ফেরতের পাশাপাশি একই সময়ে ব্যাংকে নতুন অর্থও জমা হচ্ছে। ৭ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর—চার দিনে নতুন করে ৮৯৪ কোটি টাকা জমা পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার। একীভূত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতা ও তারল্য সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে আমানত ফেরত পেতে গ্রাহকদের ভোগান্তি নতুন ব্যাংকের কার্যক্রম শুরুর সময় বড় ধরনের উত্তোলন চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই মাত্রার চাপ দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুরু থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিল। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে একসঙ্গে ৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেয়া হয়েছে। কার্যক্রম শুরুর পর ব্যাংকটি যাতে সংকটে না পড়ে, সেজন্য অর্থের সংস্থান ও ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়াও একটি কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। প্রত্যাশার তুলনায় উত্তোলনের চাপ কম থাকায় ব্যবস্থাপনার ওপর চাপও কিছুটা কমেছে।
আমানতকারীদের উত্তোলনের পরিসংখ্যানেও পরিস্থিতির স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর ১৮ হাজার ৪৬ জন গ্রাহক ১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করেন। ৭ সেপ্টেম্বর অর্থ ফেরতের প্রথম দিনে ৮ হাজার ১২৫ জন গ্রাহক ৩১৯ কোটি টাকা উত্তোলন করেন। পরদিন ২ সেপ্টেম্বরের ১৯ হাজার ৬১৩টি আবেদনের বিপরীতে ৭ হাজার ২৩৪ জন গ্রাহক ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা চাহিদার মধ্যে ৩৪০ কোটি টাকা তুলে নেন।
৯ সেপ্টেম্বর ফেরত দেয়ার কথা ছিল ৩ সেপ্টেম্বর আবেদন করা ২১ হাজার ৮৬ গ্রাহকের ৯২৩ কোটি টাকা। কিন্তু ওইদিন ১০ হাজার ৬৯৭ জন গ্রাহক ৩৮১ কোটি টাকা উত্তোলন করেন। সর্বশেষ ৬ সেপ্টেম্বর আবেদন করা ১৫ হাজার ৪৭৬ জনের ৬৫৭ কোটি টাকা ফেরতের বিপরীতে ৯ হাজার ৪১ জন আমানতকারী ৩৯১ কোটি টাকা তুলে নেন।
অর্থ ফেরতের সুযোগ পাওয়ার পরও গ্রাহকদের একটি বড় অংশ টাকা না তোলার ঘটনাকে ব্যাংকের প্রতি আস্থার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবেদুর রহমান সিকদার। তিনি বলেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ধারণা করেছিল আরো বেশি গ্রাহক অর্থ উত্তোলনের আবেদন করবেন। কিন্তু প্রত্যাশিত মাত্রায় আবেদন হয়নি। যারা আবেদন করেছেন, তাদেরও বড় একটি অংশ এখনো অর্থ তুলছেন না। শাখা থেকে যোগাযোগ করা হলে অনেকেই টাকা না তোলার কথা জানিয়েছেন।
তার ভাষায়, এর অর্থ ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। গ্রাহকদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল আমানতের ওপর কোনো ধরনের হেয়ারকাট না করা। সেই দাবি পূরণের পাশাপাশি মাসিক স্কিমের অর্থও দেয়া হচ্ছে। ব্যাংকে অর্থের প্রবাহ ও লেনদেন কার্যক্রম প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। নগদ লেনদেনের পাশাপাশি আরটিজিএস, বিএফটিএন ও ক্লিয়ারিং কার্যক্রমও চালু হয়েছে। ফলে নতুন করে আমানতও আসছে।
পরিসংখ্যানও এ বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ৭ সেপ্টেম্বর ব্যাংকে নতুন করে ১৪১ কোটি টাকা জমা পড়ে। পরদিন জমা হয় ১৯৫ কোটি টাকা। ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর জমা পড়ে যথাক্রমে ২৪৪ কোটি ও ৩১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ চার দিনে নতুন আমানত এসেছে ৮৯৪ কোটি টাকা।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়েছে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা ও তারল্য সংকটে বিপর্যস্ত এসব ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়া এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যায় পড়েছিল। পরে পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়।
নতুন ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দিয়েছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার হিসেবে দেয়ার কথা। একীভূতকরণের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একটি নতুন ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক কাঠামোর আওতায় আনার পাশাপাশি আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
আমানত ফেরতের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রথমে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত বীমা তহবিল থেকে পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে পুরো আমানত ফেরতের জন্য বিশেষ স্কিম ঘোষণা করা হয়। এক পর্যায়ে আমানতের ওপর মুনাফা কর্তন বা হেয়ারকাটের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও আমানতকারীদের চাপের মুখে তা প্রত্যাহার করা হয়। গত ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানান, আমানতের ওপর কোনো হেয়ারকাট প্রযোজ্য হবে না। একই সঙ্গে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী আমানত উত্তোলনের সুযোগ দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়।
অর্থ ফেরতের ঘোষণা এবং ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তার পর ধারণা ছিল, বিপুলসংখ্যক আমানতকারী দ্রুত অর্থ তুলে নেবেন। কিন্তু বাস্তবে উত্তোলনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। বরং নতুন অর্থও ব্যাংকে প্রবেশ করছে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ের তারল্য ব্যবস্থাপনায় যে ধরনের চাপের আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা এখনো তৈরি হয়নি।
তবে এই স্বস্তিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ নতুন ব্যাংকের সামনে শুধু আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখার প্রশ্নই নেই, রয়েছে বিপুল খেলাপি ঋণ, দুর্বল সম্পদ, অতিরিক্ত জনবল, শাখা-উপশাখার পুনর্বিন্যাস এবং পাঁচটি ব্যাংকের আলাদা কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা একীভূত করার মতো বড় চ্যালেঞ্জ।
পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত জনবল প্রায় ১৬ হাজার। শাখা রয়েছে ৭৫৯টি এবং উপশাখা প্রায় ৭০০। অনেক এলাকায় একাধিক ব্যাংকের শাখা পাশাপাশি রয়েছে। কোথাও একই এলাকার মধ্যে তিন-চারটি ব্যাংকের শাখা রয়েছে, আবার কোথাও পাঁচ ব্যাংকের একাধিক শাখা ও উপশাখা রয়েছে। ফলে শাখা ও জনবল পুনর্গঠন ছাড়া নতুন ব্যাংককে কার্যকর ও ব্যয়-সাশ্রয়ী কাঠামোয় নিয়ে আসা কঠিন হবে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবেদুর রহমান সিকদার জানান, চলতি মাসেই নতুন ব্যাংকের নামে একটি মডেল শাখা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে পাঁচ ব্যাংকের কার্যক্রম একটি কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হবে। তবে পাঁচটি ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম একীভূত করে নতুন ব্যবস্থায় নিতে সময় লাগবে। নতুন সুইফট কোড চালুর বিষয়টিও প্রক্রিয়ার অংশ। তার মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রাহকের আস্থা ফেরানো ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ; এখন জনবল ও শাখা পুনর্গঠনের দিকে নজর দেয়া হচ্ছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অবশ্য এর সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকগুলোর বিপুল খেলাপি ঋণ। ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণই ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।
পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি, ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশই খেলাপি। এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৭ হাজার ১৩৪ কোটি এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৪ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। দুই ব্যাংকেরই বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৯৭ শতাংশ খেলাপি।
এই বাস্তবতায় আমানতকারীদের আস্থা ফিরে আসা নতুন ব্যাংকের জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সূচনা। তবে দীর্ঘমেয়াদে সেই আস্থা ধরে রাখার জন্য তারল্য সহায়তার পাশাপাশি ব্যাংকের নিজস্ব আয়ক্ষমতা ও মূলধনভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়, দুর্বল সম্পদের ব্যবস্থাপনা, নতুন ঋণ বিতরণে কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা ছাড়া কেবল তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভর করে ব্যাংকটিকে টেকসই করা সম্ভব হবে না।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিনও আমানত উত্তোলনের তুলনামূলক কম হারকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, অর্থ তোলার সুযোগ পাওয়ার পরও উত্তোলনের হার এত কম থাকা প্রমাণ করে, নানা সংকটের মধ্যেও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়নি। পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠন এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়োগকে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
তবে তার মতে, এখন সবচেয়ে বড় কাজ জনবল ও অবকাঠামো পুনর্গঠন। সঠিক দিকনির্দেশনা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক দ্রুত স্থিতিশীল অবস্থানে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ড. ফাহমিদা খাতুনের মূল্যায়নও একই দিকে। তার মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বলতার পরও গ্রাহকরা ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখছেন—এটি ইতিবাচক লক্ষণ। তবে নতুন ব্যাংকটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া যেন সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় এবং এর বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকে, সে বিষয়ে সরকারের নজরদারি জরুরি।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে তাই এখন দ্বৈত পরীক্ষা। একদিকে স্বল্পমেয়াদে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের প্রতিশ্রুতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করে আস্থা ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে একটি দুর্বল ব্যাংকগুচ্ছকে আর্থিকভাবে সক্ষম ও সুশাসনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে। প্রথম পরীক্ষায় আপাতত ইতিবাচক ফল মিললেও দ্বিতীয় পরীক্ষার সাফল্য নির্ভর করবে খেলাপি ঋণ, অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা যায় তার ওপর।![]()