দেশের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কয়লার চাহিদার বড় অংশ স্থানীয় উৎস থেকে মেটানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনি থেকে বছরে দেড় কোটি টন কয়লা উত্তোলন করা গেলে বর্তমানে আমদানি করা কয়লার প্রায় ৭৫ শতাংশের চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে বলে মনে করছেন জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারকরা। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি কয়লা আমদানিতে ব্যয় হওয়া বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
দেশে প্রতি বছর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য প্রায় দুই কোটি টন কয়লা আমদানি করা হয়। বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলিত কয়লার পুরোটাই বর্তমানে ওই এলাকার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহার হচ্ছে। গ্যাসের সংকট এবং জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মধ্যে সরকার এখন স্থানীয় কয়লা ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করছে।
দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় সরকার ১০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করতে যাচ্ছে। চলতি মাসেই পরিকল্পনাটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হতে পারে। এর অংশ হিসেবে স্থানীয়ভাবে কয়লা উত্তোলনের বিষয়টিও রাখা হচ্ছে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নীতি প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ আয়োজিত এক সভায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন আমরা কয়লার উত্তোলনের দিকে যাচ্ছি। ফুলবাড়ী ও অন্যান্য স্থানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনে এগোতে হচ্ছে। কারণ আমাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মিশ্রণের বিষয়ে আমরা মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নীতি দেয়া হবে।’
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনিতে আনুমানিক ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭২ মিলিয়ন টন উত্তোলনযোগ্য বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে। খনিটি থেকে বছরে প্রায় ১৫ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব বলে জানিয়েছে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিসিএমসিএলের এক কর্মকর্তা জানান, ফুলবাড়ী খনিতে ভূপৃষ্ঠের প্রায় ২৪০ মিটার গভীরেই কয়লার স্তর রয়েছে। সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে খনিটি পূর্ণ সক্ষমতায় নিতে প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে বছরে ১৫ মিলিয়ন টন কয়লা উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
দেশে কয়লাভিত্তিক সাতটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৭ হাজার ৩১২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থানীয় কয়লা ব্যবহার করে। অন্য ছয়টি কেন্দ্রের জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে বছরে অন্তত দুই কোটি টন কয়লা আমদানি করতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে কয়লা আমদানির জন্য ১১৯ কোটি ১১ লাখ ডলারের ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা। ফলে স্থানীয়ভাবে কয়লা উৎপাদন বাড়াতে পারলে আমদানি ব্যয়ে বড় ধরনের সাশ্রয় হতে পারে।
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ২৮ শতাংশ কয়লাভিত্তিক। বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। অন্যদিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট হলেও গ্যাসের সংকটে এসব কেন্দ্রের বড় একটি অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। একই সময়ে আমদানি করা কয়লার দাম পরিশোধ করতেও বিপিডিবিকে আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্থানীয় কয়লা দিয়ে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হলে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি নিরাপত্তা কিছুটা বাড়বে। তবে ফুলবাড়ীসহ দেশের কয়লাখনিগুলো থেকে কয়লা উত্তোলনের আগে পরিবেশ, কৃষি, পানি, জনবসতি ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশের কয়লা উত্তোলনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিরপেক্ষ সমীক্ষা প্রয়োজন। তার মতে, কয়লা উত্তোলনের পুরো ব্যবস্থাপনা স্বার্থসংশ্লিষ্ট নয়—এমন তৃতীয় কোনো পক্ষ দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। ঝুঁকি সীমিত এবং তা মোকাবিলা সম্ভব হলে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। অন্যথায় দেশীয় কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা বাদ দেওয়ার কথাও বিবেচনা করা উচিত।
দেশে মোট পাঁচটি কয়লাখনি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মজুদ রয়েছে জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে, প্রায় ৫ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন টন। রংপুরের খালাশপীরে ৬৮৫ মিলিয়ন টন, দিনাজপুরের দিঘিপাড়ায় ৭০৬ মিলিয়ন টন এবং বড়পুকুরিয়ায় ৪১০ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ রয়েছে। বর্তমানে কেবল বড়পুকুরিয়া খনি থেকেই কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। সেখানে বছরে প্রায় সাত লাখ টন কয়লা উত্তোলন করছে চীনা কনসোর্টিয়াম এক্সএমসি-সিএমসি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি ও অপারেশন অ্যান্ড মাইন্স) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সমীক্ষার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে কয়লা উত্তোলনের কার্যক্রম নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বড়পুকুরিয়া খনির কেন্দ্রীয় অংশের উত্তর পাশে আরও ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। কোল মাইনিং ডিজাইনের জন্য শিগগিরই ছয়টি বোরহোল খনন শুরু হবে। ওই ডিজাইনের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ফুলবাড়ী খনি নিয়ে এর আগেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০০৬ সালের আগস্টে স্থানীয় বাসিন্দারা কয়লা উত্তোলনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। কৃষিজমির ক্ষতি, পরিবেশ বিপর্যয়, বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা এবং বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে কয়লা উত্তোলনের প্রতিবাদে আন্দোলন গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে সংঘর্ষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে তিনজন নিহত ও অনেকে আহত হন।
ফলে ফুলবাড়ী থেকে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ এবারও শুধু জ্বালানি ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। স্থানীয় মানুষের স্বার্থ, পরিবেশগত ঝুঁকি, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের বিষয়গুলোও সরকারের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঝুঁকি যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারলে দেশের নিজস্ব কয়লা সম্পদ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।