৩০ সেকেন্ডের কল, ৪৫ বছরের অপেক্ষার অবসান
জুবায়ের কামাল
বনানীর একটা অভিজাত ফ্ল্যাটে সোফার উপর হেলান দিয়ে যখন টিভির রিমোর্টটা হাতে নিলেন, তখনই কলটা এলো। বিশ্বকাপ চলছে, এই মুহুর্তে ফোন ধরার প্রশ্নই আসে না। তাও ধরলেন, ৩০ সেকেন্ড হ্যালো হ্যালো করলেন, কেউ উত্তর দিলো না। শুধু ঘ্যার ঘ্যার শব্দ হয়। ৩০ সেকেন্ড পর কলটা কেটে গেল। ফোনটা রাখতে রাখতে লোকেশন ট্র্যাক হয়ে গেল মোজাফফর হোসেনের। খেলার দিকে যখন মনোযোগ দিচ্ছেন মোজাফফর, ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ তখন তৈরি হচ্ছে তাকে হাতেনাতে ধরতে। যাকে ধরার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে ৪৫ বছর!
১৯৮১ সালের ৩০ মে একটা গরমের রাত। চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে আছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। গভীর রাত পর্যন্ত সার্কিট হাউজে বসে নিজ দলের লোকেদের সঙ্গে সভা করেছেন, দ্বন্দ্ব ও সমোঝতা নিয়ে আলাপ করেছেন। তিনি ঘুমুনোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সঙ্গে সেনাবাহিনীর একটা অংশ প্রস্তুতি নিচ্ছে জিয়াউর রহমানকে খুন করার। রাত একটু গভীর হলো, কাঁচা রাস্তার অনেকটাই নিঃশব্দে এগিয়ে এলো সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি। নেমে এলো কয়েকজন। বুটের আওয়াজ এগিয়ে আসছে, জিয়া আধো ঘুমেও এই শব্দ শুনছেন, এই বুটের আওয়াজ তার বড্ড অচেনা।
সামনে এগিয়ে গেল একজন। তিনি যেন কোনোভাবেই অস্ত্রের মুখ থেকে পালাতে না পারেন, তার পাশে দাঁড়ালো একজন মেজর। জিয়া তাকে চিনলেন। কিন্তু কিছু বলতে পারলেন না, তার আগেই রাইফেলের গুলি ছেদ করে দিল জিয়াউর রহমানের বুক। মেজর কপালে জমে থাকা ঘাম নিয়ে বের হয়ে গেলেন সার্কিট হাউজ থেকে। তার বুকে নেমপ্লেটের দিকে তাকালে দেখা যেত তার নাম, মোজাফফর।
মেজর মোজাফফর হোসেন!
সেই রাতে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর একদম হাওয়া হয়ে গেলেন মেজর মোজাফফর। তাকে ধরার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা হলো, কিন্তু মেজর মোজাফফর হোসেন যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন।
ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পট পাল্টে যেতে লাগলো, এই আওয়ামী লীগ, তো এই বিএনপি, এভাবেই চললো এক যুগের বেশি। আড়ালে থেকে গেলেন মেজর মোজাফফর, কেউ তার কথা মনে রাখল না।
শুধু মনে রাখলেন একজন। জিয়াউর রহমানের সন্তান, তারেক রহমান।
মোজাফফর হোসেন ভেবেছিলেন চল্লিশ বছর আগে করা একটি হত্যার ঘটনা ও তার পরে হাওয়া হয়ে যাওয়া চরিত্র হিসেবে তাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু একটি ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান সরলরৈখিক ইতিহাসকে উল্টেপাল্টে দিলো।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নতুন করে শুরু হলো। প্রসিকিউশন খুঁজে বের করা শুরু করলো তাদের, যারা স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতায় আনার এবং বাংলাদেশকে বিরাজনীতিকরণ করে দীর্ঘদিনের জন্য অগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরি করার পথ সুগম করেছিল।
এক এগারো সরকার!
সেই কুখ্যাত ওয়ান এলিভেন গর্ভমেন্টের কুশীলবদের নিয়ে খোঁজা শুরু করলো আইসিটির প্রসিকিউশন। তারা পেলেন অন্যতম এক কুশীলবকে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন। তাকে ধরতে পারলে সুতোর টানে আরও অনেক সত্য বেরিয়ে আসবে। গ্রেফতার হলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ। প্রসিকিউশন টিম তাকে নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলো। তার চলাচল, লেনদেন, ফোনকল সব কিছু চেক করতে লাগলো। সেসময় তাদের চোখ আটকে গেল কল লিস্টে।
ভিন্ন কয়েকটি নাম্বার থেকে কল করা হয়, ম্যাসেজও দেয়া হয়। কিন্তু প্যাটার্নটা একই রকম, যেন ভিন্ন নাম্বার হলেও মানুষটা একই!
ট্রাইব্যুনাল আরও তদন্ত করার জন্য এই লোকের সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড) নেয়। মাসুদ উদ্দিনের মুঠোফোন থেকে যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, তাঁদের সবার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সিডিআরে ২০২৩ সাল থেকে রাজধানীর বনানী ও মিরপুর ডিওএইচএসের একই অবস্থান থেকে একাধিক নম্বরে মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে এক ব্যক্তির কথা বলা, এসএমএস আদান–প্রদানের তথ্য পাওয়া যায়। ফোনালাপগুলোর সময়কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত।
লোকটা কে তা বের করতে না পারলেও, বোঝা যাচ্ছিল এ গুরুত্বপূর্ণ কেউ। পুলিশ এই নাম্বারটির নিবন্ধন অনুযায়ী বের করে মালিকের ঠিকানা। কিন্তু…
জানা যায়, নিবন্ধন ভুয়া। নিজের পরিচয় আড়াল করে কেউ দোকান থেকে রেজিস্ট্রেশন করে সিমগুলো কিনেছে। একদম কাছে এসেও তাকে ধরতে পারে না পুলিশ।
ট্রাইব্যুনাল অনেক চেষ্টা করেও কারা এই ফোন নাম্বার থেকে কথা বলছেন, তাদেরকে বা তাকে চিহ্নিত করতে পারছিল না। তখন পুলিশ সদর দপ্তরের সাহায্য নিতে হয় ক্রাইম ট্রাইব্যুনালকে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পেরে ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ ও বিশেষায়িত ফরেনসিকের মাধ্যমে সমন্বয় করে লোকটাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। কিছুটা বুদ্ধি আর কিছুটা তথ্য প্রযুক্তির সহযোগীতার বের হয়ে আসে একটা ছায়া। কিন্তু পুলিশ যাকে ভাবছে, সে হলে তো ঘুরে যাবে ইতিহাস। তাই কোন রিস্ক নেয়া যাবে না। আগে তার বর্তমান লোকেশন বের করতে হবে, একদম মাথা ঠাণ্ডা করে ধীরে সুস্থে।
তখন ফাঁদ পাততে একটি ফলস কল করে ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ। কলটি ধরে একসময়কার ঠাণ্ডা মাথার খুনি মেজর মোজাফফর। ত্রিশ সেকেন্ডের কল রিসিভই তার লোকেশন বের করে আনে। ধরা পরে মোজাফফর হোসেন।
এই লোকের দেখা পেতে ৪৫ বছর অপেক্ষা করেছেন একজন। তার নাম… বর্তমান বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।