সাবরিনা হোসেন
বাবার বিয়ে খাওয়ার সৌভাগ্য বলুন বা দুর্ভাগ্য বলুন সন্তানের কপালে সাধারণত জোটে না। আমার প্রাক্তন যখন ডিভোর্সের চার বছর পর পুনর্বিবাহের সিদ্ধান্ত নিলেন আমি বাচ্চাদের সাজিয়ে গুজিয়ে তাদেরকে বাবার বিবাহের অনুষ্ঠানে পাঠালাম!
বললাম, সৎ মা কে গিয়ে চুমু দিবে! কারন, সৎ হোক বা অসৎ হোক , যেই সম্পর্কের সাথে মা শব্দটি যুক্ত থাকে তিনি সন্মান ও মর্যাদার দাবিদার।
আমি খুব মহৎ তা বলব না – আসলে তখন ক্যারিয়ার গড়তে আমি এতটাই ব্যস্ত যে একাকিত্ব আমাকে বিন্দুমাত্র পীড়া দেয়না। ঐ সময়, পড়াশোনা আমার স্বামী, হাসপাতাল আমার সংসার, সার্জারি আমার প্রেম !
যখন কারাগারে গেলাম, বাচ্চার ফুফুদের বললাম, ওদের পাসপোর্টে, স্কুলের আইডি তে মায়ের নামের স্থানে ওদের সৎ মায়ের নাম দিয়ে দেন- আমি চাইনা আমার নাম বা বদনামের কারনে ওরা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হোক !
তিন বছর পেরিয়েছে জেলে ! বের হবার তিন মাস পরের ঘটনা- আমার মেয়ের স্কুলে parents teacher meeting উপলক্ষ্যে অভিভাবকদের ডাকা হয়েছে! আমি মেয়েকে বললাম, আমি যাব না! আমি সাথে গেলে কেউ যদি তোমাকে বুলি করে , তামাশা করে!!
মেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দৃঢ় কন্ঠে ইংরেজিতে যা বললো, তার বাংলা অর্থ হলো -“তুমি কোন অপরাধ করো নি মা ,আমি তোমার সাথেই যাব!”
স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকতে আমার পা দ্বিধাগ্রস্থ, হাত ঘামছে, গলা শুকিয়ে কাঠ ! আমার মেয়ে শক্ত করে আমার হাত ধরে আছে ! সেই হাত ভরসার, বিশ্বাসের আর এক আকাশ সমান ভালোবাসার !!
পুরো পৃথিবী আমাকে মিথ্যে অপবাদ দিয়েছে, উপহাস করেছে , বন্দিনীর তকমা দিয়েছে কিন্তু আমার সন্তানের হৃদয়ে শ্রদ্ধা আর গভীর মমতা দিয়ে যে মাতৃ মূর্তি আঁকা তা বিন্দুমাত্র টলাতে পারে নাই!
সম্প্রতি দেখলাম, চুরির অভিযোগে খুঁটির সাথে বাঁধা বাবা- পিতার মুখে রুটি তুলে দিচ্ছে মেয়ে !
সমস্ত পৃথিবীর কাছে সে অপরাধী অথচ তার মেয়ের কাছে সে শুধু বাবা! কোন কালিমা সেই বাবা সম্পর্কটিকে একটুও ম্লান করতে পারেনা!
আমাদের দেশের মানুষ শত কোটি টাকা যে চুরি করে তাকে বাঁধতে পারে না, একশ টাকা চুরির অভিযোগে বেঁধে রাখে ! যে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে তাকে সেলুট দেয় আর হাজার টাকা চুরির অভিযোগে পিটিয়ে মারে!
এই মানুষটিকেও না জানি দারিদ্র্যের কত নির্মম কষাঘাত, কত শত মানুষের কটু কথা আর অভিশাপ, কত বেদম প্রহার সইতে হয় ! প্রতিনিয়ত কত অপমান আর অপদস্থ হতে হয় !
কিন্তু, জানেন, দিনশেষে তার একটা পরী আছে!
যে পরীটা কোমল হাতে তাকে খাইয়ে দেয় ! দুনিয়ার ভ্রূকুটির ভ্রূক্ষেপ সেই পরী কখনও করেনা !
জগতের কাছে ভিলেন হলেও তার কাছে তার আব্বা সুপারহিরো!![]()