সাভারের ছোট কালিয়াকৈরের কামালপুর এলাকায় ১৭ একর বনভূমিতে এগ্রো ট্যুরিজম ও রিসোর্ট প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়ে আইনি ও পরিবেশগত প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পটির প্রচারণায় এটিকে কৃষি, পর্যটন ও বিনোদননির্ভর উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হলেও সংশ্লিষ্ট জমির শ্রেণি, ব্যবহার-অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং বিনিয়োগ কাঠামো নিয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ না হলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে জমির কোনো অংশ যদি সরকারি বনভূমি বা বন বিভাগের ব্যবস্থাপনাধীন ভূমি হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও সরকারি অনুমোদনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইনে বনভূমির বনবহির্ভূত ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। আইনে প্রাকৃতিক বনকে বনবিরুদ্ধ বা বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অন্যান্য বনভূমির ক্ষেত্রে অপরিহার্য জাতীয় প্রয়োজন, বিকল্প না থাকা, পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন এবং সরকারের নির্ধারিত অনুমোদনসহ একাধিক শর্তের কথা বলা হয়েছে।
ফলে কামালপুরের প্রস্তাবিত প্রকল্পের ১৭ একর জমির প্রকৃত মালিকানা ও শ্রেণি কী, জমিটি বন বিভাগের কোন ধরনের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে এবং প্রকল্পের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কী ধরনের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য যাচাই করা জরুরি। কেবল কোনো লিজ, ইজারা বা চুক্তিপত্র থাকলেই বনভূমিতে বাণিজ্যিক রিসোর্ট স্থাপনের বৈধতা নিশ্চিত হয় না; জমির শ্রেণি ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী অনুমোদনের বৈধতাও দেখতে হবে।
প্রকল্পের সঙ্গে ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিজমি যুক্ত করার পরিকল্পনা থাকলেও সেখানেও রয়েছে নতুন আইনি বাস্তবতা। ২০২৬ সালের ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা আইনে কৃষিভূমি, জলাধার ও জলাভূমির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। আইনে কৃষিভূমিতে বাণিজ্যিক আবাসন, রিসোর্ট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা অনুরূপ স্থাপনা নির্মাণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অনুমোদন ছাড়া কৃষিভূমিকে অকৃষি কাজে ব্যবহার এবং অনুমোদন ছাড়া ভূমির জোন পরিবর্তনের বিরুদ্ধেও বিধান রয়েছে।
এ কারণে প্রকল্পের আওতায় থাকা বা ভবিষ্যতে কেনার পরিকল্পনা করা জমিগুলো আসলে কোন শ্রেণির, সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূমি জোনিং কী এবং রিসোর্ট নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না—তা যাচাই ছাড়া বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
পরিবেশগত দিক থেকেও প্রকল্পটির প্রভাব মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। বনাঞ্চল, কৃষিজমি, জলাধার কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশের কাছাকাছি বড় পরিসরের পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ব্যবহার, পয়োনিষ্কাশন, শব্দদূষণ, যানবাহনের চাপ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাবের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হয়। প্রকল্পের ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং প্রয়োজনীয় পরিবেশগত মূল্যায়নের বাধ্যবাধকতা আছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি দেখে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিনিয়োগ কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রকল্পটি যদি সীমিত সংখ্যক শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগ সংগ্রহ করে থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রকল্পের মোট ব্যয়, জমির মালিকানা বা বৈধ ব্যবহারাধিকার, শেয়ারের প্রকৃতি, মুনাফা বণ্টন, বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সুযোগ, প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা এবং সম্পদের ওপর বিনিয়োগকারীদের আইনগত অধিকার—এসব বিষয় স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
বিশেষ করে প্রকল্পের মূল সম্পদের একটি বড় অংশ যদি লিজ বা অন্য কোনো চুক্তির ভিত্তিতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেই সম্পদের ওপর বিনিয়োগকারীদের মালিকানা তৈরি হয় কি না, সেটিও আলাদাভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। ভবিষ্যতে জমির ব্যবহার নিয়ে সরকারি বা আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত হলে প্রকল্পের স্থাপনা ও বিনিয়োগের কী হবে, সে বিষয়েও চুক্তিতে সুস্পষ্ট বিধান থাকা প্রয়োজন।
তাই সাভারের কামালপুরে প্রস্তাবিত এগ্রো ট্যুরিজম ও রিসোর্ট প্রকল্পে বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট জমির খতিয়ান, দাগ ও শ্রেণি, বন বিভাগের নথি, লিজ বা ইজারা চুক্তি, ভূমি ব্যবহার অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদন এবং কোম্পানি বা প্রকল্পের বিনিয়োগ চুক্তিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্পের নামে শেয়ার বা বিনিয়োগ সংগ্রহের আইনগত কাঠামোও পরীক্ষা করা দরকার।
প্রকল্পটির উদ্যোক্তাদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট বন, ভূমি ও পরিবেশ কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই না করে এটিকে বেআইনি বা পরিবেশবিরোধী বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমীচীন নয়। তবে জমির শ্রেণি, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং বিনিয়োগকারীদের আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।![]()