পোর্টল্যান্ড রেলস্টেশনটি, ট্রেন যেখানে এসে থামে, পুরনো দিনের সাদামাটা স্টেশনের মতো, কিন্তু তার ভবনটি রাজকীয়, ভীষণ উঁচু ছাদ আর মার্বেল পাথরের দেয়াল নিয়ে সুগম্ভীর; প্রাচীন ঐতিহ্য ধারণ করে থাকা অ্যান্টিক। দুটি অ্যামট্রাক ট্রেন, লম্বা দুটোই, যেন দুই অজগর, প্লাটফর্মে লম্বা গা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। আমরা একটির পেটের খোঁড়ল থেকে বের হয়ে আরেকটির ভয়ংকর মুখের সমুখ দিয়ে পার হই। ভাগ্যিস সে ঘুমাচ্ছিল। পার হয়ে এসে ঢুকি ওই বিপুল ছাদের নিচে।
বিশাল হলঘরটির আয়তক্ষেত্র আকৃতির সমুখভাগটি অর্ধবৃত্তাকার, সেদিকটায় ঘেরাটোপ দেওয়া ইনফরমেশন সেন্টার, কয়েকটি ডিজিটাল পর্দা। আয়তের লম্বা দুই বাহুর দুপাশে চারটি করে আটটি আর্চ নকশা, নিচে বৃহৎ দরোজাগুলি। পাথরে নির্মিত দেয়ালের গায়ে দরোজার হালকা সোনালী গাত্রের উপর অধিকতর সোনালী অক্ষরে লেখা রয়েছে স্টেশনের বিভিন্ন ফাংশান- যেমন ব্যাগেজ, টেলিফোন, ওয়েটিং রুম, পার্সেল, সংবাদপত্র, বাইরে বেরুবার পথ, স্টেশন মাস্টারের ঘর প্রভৃতি। আয়তের হ্রস্ব বাহুর, যেটি অর্ধবৃত্তাকার নয়, সরলরেখা, সেখানে একটি দরোজা যাত্রী আগমনের জন্য অবারিত, অন্য দুটি ট্রেন ধরতে প্লাটফর্মে যাওয়া বা নির্গমনের (To Trains)। বিশাল উঁচু ছাদটি বর্গক্ষেত্রের চারপাশে বর্ডার দেওয়া পদ্মফুলের নকশার, তাকালে মনে হবে ছাদপুকুরে অজস্র পদ্মফুল ফুটে আছে।![]()
মসৃণ কাঠের লম্বাটে বেঞ্চিতে বসে আমি আমার প্রাক্তন ছাত্রী মারিয়া সাইনার জন্য অপেক্ষা করি। বিপরীত বেঞ্চিতে ছয়টি শুভ্রবর্ণের, কেউ বালক, কেউবা বালিকা, কেবল দুজন তরুণ-তরুণী, বসে আছে। কোলের শিশুকে নিয়ে যে ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে রয়েছেন আমি তাকে সাহসভরে জিজ্ঞেস করি, তিনি এই শিশুদের মা কিনা? তিনি বলেন, ছয়জনের চারটি তার, বাকি দুজন তার সন্তানদের বন্ধু। তিনি একথাও যোগ করেন যে তার মোট সাতটি সন্তান রয়েছে। আমেরিকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বিবাহহীন, সন্তানহীন জীবন কাটান, অনেকেই সন্তান পালনের দায়িত্ব নিতে চান না, ফলে যখন তারা মারা যান তাদের বংশধারার কেউ অবশিষ্ট থাকে না। বিপরীতে যারা সন্তান নেন, তারা একসঙ্গে অনেকগুলে সন্তানের পিতা-মাতা হন। ভদ্রমহিলা খুবই অমায়িক, আমার অনুরোধে তিনি তার সন্তানদের ডাকেন আমার সাথে সেলফি তোলার জন্য, নিজেও শিশুকোলে স্মিত দাঁড়ান।![]()
স্টেশনের বাইরে এসে আমি পোর্টল্যান্ড ইউনিয়ন স্টেশনটির বহিস্থ রূপটি দেখতে পাই।এ স্টেশন যে অনেক পুরনো তা এর স্থাপত্য নকশা দেখে বোঝা যায়। লালরঙের একটি দালান, ওপাশে আরেকটি ওভালশেপের দালান, মাঝে রয়েছে বিগবেন সদৃশ্য উঁচু ক্লক টাওয়ার। একজন নারী চালককে দেখে আমি ভেবেছিলাম মারিয়া সাইনা, লাগেজ নিয়ে এগিয়ে যাই, কিন্তু সে গাড়ি থামে না, একটু বিভ্রান্ত হই আর তখনই চোখে পড়ে একটি টকটকে লালরঙের টেসলার চালকের আসনে মারিয়া আমাকে ইশারা করছে। সাক্রামেন্টো বিমানবন্দরে সাদা টেসলা নিয়ে এসে আমাকে যেমন চমকে দিয়েছিলেন মোহাম্মদ বিল্লাহ ওরফে রানা ভাই, তেমনি চমকে দিল মারিয়া। আরও চমক এটি সেলফ ড্রাইভিং লেটেস্ট মডেলের টেসলা। মারিয়া কিনেছে এক সপ্তাহও হয়নি, সেটি গাড়িটির ঝা-চকচকে গা দেখেই বোঝা যায়।
Self Driving Car শুনে আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম, অর্থাৎ মারিয়াকে কিছু করতে হবে না, কেবল গন্তব্য জিপিএসে টাইপ করে দিলেই হবে, গাড়ি নিজে নিজে গুগল ম্যাপ অনুসরণ করে চলতে থাকবে, চারপাশে লাগানো ক্যামেরা দিয়ে পরিপার্শ্ব স্ক্যান করতে থাকবে, আর ট্রাফিক সিগনাল মেনে চলতে থাকবে। মারিয়া যখন হাত গুটিয়ে বসে রইল আর টেসলা নিজে থেকেই চলতে শুরু করল, তখন একটু ভয়ই পেলাম, না জানি টকটকে লাল, চকচকে গা, ঝকঝকে গাড়ি ভুল করে কোথায় গিয়ে ঢুঁশ মারে।![]()
মারিয়ার প্ল্যান ছিল ওর কর্মক্ষেত্র নাইকিতে আমাকে প্রথমে নিয়ে যাবে, পরে বিভারটনে ওদের বাড়িতে। নাইকি না গিয়ে সরাসরি বাড়িতে যাব বলায় সে গাড়িকে গন্তব্য দিয়েছিল বাড়ি, কিন্তু যখন সে শুনল আমি দুপুরে কিছু খাইনি তখন গন্তব্য পাল্টে নাইকি দিল। এরফলে Williamette নদীর উপর যে লোহার ট্রাসের পুরনো ব্রিজটি রয়েছে সেটি দুবার অতিক্রম করলাম আর দুবারই পোর্টল্যান্ড ডাউনটাউনের স্কাইস্ক্রাপারগুলো তাদের স্ব স্ব মহিমা ও রূপ নিয়ে দলবদ্ধরূপে দেখা দিল। ব্রিজটির উপর দিয়ে যাওয়ার সময় তার দুপাশে ও উপরে লোহার প্রকাণ্ড ট্রাসগুলোকে হাওড়া ব্রিজের সদৃশ্য মনে হলো। মনে হলো হাওড়া ব্রিজ পেরুচ্ছি, নিচে উইলিয়ামেট নদী নয়, ভগীরথী।
মারিয়া চলে এলো, বলা ভালো টেসলা আমাদের নিয়ে এলো Nike এর হেডকোয়ার্টারে। অনেকগুলো, একেকটি একেক স্থাপত্য নকশার ও সৌন্দর্যের, একসাথে ধরা দিল। শুনে অবাক হলাম এখানে নাইকির ১৮০ টি দালান রয়েছে, যে দালানে মারিয়ার অফিস তার নাম ‘ঈগল’। নাইকি ক্যাম্পাস তখন চুপচাপ শান্ত, কেননা বিকেল পাঁচটা বাজে আর দিনটি উইকএন্ড শুরুর আগের দিন।
মারিয়া আমাকে নিয়ে গেল Popeyes ফাস্টফুড চেইনের একটি আউটলেটে। যদিও কাছেই বিখ্যাত ফাস্টফুড চেইন ম্যাকডোনাল্ডস ছিল আমরা তাতে যাইনি, কারণ ম্যাকডোনাল্ডস তার কাস্টমারদের প্রসেসড ফুড খাইয়ে প্রভূত বদনাম কুড়িয়েছে। সবাই জানে প্রসেসড ফুড ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। আমেরিকায় দেখছি বিভিন্ন ফাস্টফুড আউটলেট একটি জোনের ভেতর স্ব স্ব জায়গা নিয়ে দাঁড়ানো, প্রত্যেকের চেহারা, নাম, লোগো, রঙ আলাদা, প্রত্যেকেই চেষ্টা করে কর্নার প্লটটি অধিকার করতে। নিজস্ব ডাইনিং স্পেস ও ড্রাইভিং স্পেস নিঢে তারা যেন মিনি জমিদার।
মারিয়া আমার জন্য যে কম্বো প্যাক অর্ডার করে, আমি তার অর্ধেক খেতে পারি। ম্যাকডোনাল্ডস থেকে পপাইয়াসকে আলাদা কিছু মনে হয় না। অতঃপর মারিয়ার বাড়ি বিভারটনের দিকে যাত্রা। ফের টেসলার হাতে ভাগ্য সমর্পণ, মনে মনে প্রার্থনা, ‘হে টেসলা দেবী, আমায় রক্ষা করো, মা!![]()