ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে আবারও সামনে এসেছে পুরোনো দুই ইস্যু। একদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লিতে স্বাগত জানাতে ভারতের আগ্রহ, অন্যদিকে সফরের আগে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত চাওয়ায় তৈরি হয়েছে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে আলোচনা চলছে। চলতি মাসেই সফরটি হতে পারে—এমন আলোচনা থাকলেও এখনো চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা হয়নি। ভারতীয় পক্ষ সফরটি দ্রুত আয়োজনের আগ্রহ দেখালেও সফরের আগে অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ।
গত রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক ব্যক্তিকে দ্রুত ফেরত পাঠানোর পাশাপাশি শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদেরও বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান নেওয়ার পর তাঁর প্রত্যর্পণের দাবি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। চলতি মাসেও বাংলাদেশ নতুন করে তাঁর প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, দিল্লির পক্ষ থেকে তারেক রহমানের সফর নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হচ্ছে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাঁকে যথাযথ মর্যাদায় অভ্যর্থনা জানানো হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও দুই দেশের সরকারপ্রধানের দ্রুত বৈঠকের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে সফরের আগে দুই দেশের অবস্থানের এই পার্থক্যই এখন মূল জটিলতা। ঢাকা চাইছে, সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দৃশ্যমান পদক্ষেপ হিসেবে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে অগ্রগতি আসুক। অন্যদিকে দিল্লি নিজস্ব স্বার্থ সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ভারতের পক্ষ থেকে ‘পারস্পরিকতা’র বিষয়টিও সামনে এসেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের টানাপড়েন কাটিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো একাধিক ইস্যুতেও এমন বৈঠক নতুন সমঝোতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে তারেক রহমানের দিল্লি সফর শেষ পর্যন্ত কবে এবং কী শর্তে হচ্ছে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে প্রত্যর্পণ ইস্যুতে দুই পক্ষের আলোচনার ফলের ওপর।
ফলে সম্ভাব্য সফরকে ঘিরে একদিকে যখন দিল্লির পক্ষ থেকে ‘স্মরণীয় অভ্যর্থনা’র বার্তা আসছে, অন্যদিকে ঢাকার শর্তের জটও খুলছে না। সম্পর্কের বরফ গলানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে এই সফরই—আবার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে সমঝোতা না হলে সেই সফরই আটকে যেতে পারে নতুন কূটনৈতিক জটে।