কয়েক মাস ধরে চাল, ময়দা, ভোজ্যতেল, চিনি, ডিম, দুধ, মাছ-মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এর প্রভাব পড়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বেকারি শিল্পে। কাঁচামালের বাড়তি দামের পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিতে খাবার প্রস্তুতের খরচ বেড়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুত খাবারের দাম বাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কোনো কোনো পণ্যে দাম বেড়েছে ১০ শতাংশের বেশি, আবার কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত।
হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বাড়তি খরচের একটি অংশ পণ্যের আকার বা পরিমাণ কমিয়ে সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয় একসঙ্গে বাড়তে থাকায় এখন আর সে সুযোগ থাকছে না। ফলে খাবারের দাম সমন্বয় করতেই হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোয় এরই মধ্যে বিভিন্ন খাবারের দাম বাড়ানো হয়েছে। ৮ থেকে ১৫ টাকার পরোটা এখন বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ২০ টাকায়। প্রতি প্লেট ভাতের দাম বেড়েছে ৫ টাকা। মানভেদে এক কাপ চায়ের দামও ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ছোট খাবারের দোকান ও ফুটপাতের দোকানেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. ইলিয়াস ভূইয়া বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় প্রায় ১২ হাজার হোটেল-রেস্তোরাঁ রয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনের প্রধান উপকরণগুলোর দামও বেড়েছে। ফলে খাবারের দাম বাড়ানো ছাড়া ব্যবসায়ীদের সামনে বিকল্প থাকছে না। এর প্রভাব ফুটপাতের দোকানেও পড়েছে; সেখানে চাসহ বিভিন্ন খাবারের দাম বাড়ানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়া না হলেও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো প্রস্তুত খাবারের দাম নিজেদের হিসাব অনুযায়ী সমন্বয় করছে।
বাজারের তথ্যেও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ৮ আগস্টের তুলনায় গতকাল পর্যন্ত কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম ২ থেকে প্রায় ১১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
এক মাসে খোলা ময়দার দাম ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৬৫-৭০ টাকায় উঠেছে। প্যাকেট ময়দার দাম বেড়েছে ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা এখন ৭০-৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাদা আটার দাম ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৪৮-৫০ টাকা। খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ১৯০-২০০ টাকা এবং পাম অয়েলের দাম ২ শতাংশ বেড়ে ১৬৫-১৭২ টাকায় উঠেছে।
একই সময়ে চিনির দাম ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ১১০-১১৫ টাকা, ছোলার দাম ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়ে ১০০-১১০ টাকা এবং মসুর ডালের দাম ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৯৫-১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লেয়ার মুরগির ডিমের দামও হালিতে ৩-৬ টাকা বেড়ে ৫০-৫২ টাকায় উঠেছে। প্রতি কেজি চায়ের দাম বেড়েছে ২০ টাকা। মানভেদে এখন চা বিক্রি হচ্ছে ৩৫০-৫০০ টাকা কেজি। গুঁড়া দুধের দাম বেড়েছে ২০-৩০ টাকা, যা এখন ৭০০-৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এসব পণ্যের পাশাপাশি কয়েক মাস ধরে সুগন্ধি চাল, ডিম, ব্রয়লার মুরগি, চা পাতা, চিনি, দুধ ও বিভিন্ন ধরনের মাছের দামও বাড়ছে। গ্রীষ্মকালীন সবজির বাজারও তুলনামূলক চড়া। সাম্প্রতিক সময়ে সয়াবিন ও পাম অয়েল, মসুর ডাল, ছোলা, আটা ও ময়দার দাম বাড়ায় রান্না ও খাবার তৈরির খরচ আরো বেড়েছে।
হোটেল-রেস্তোরাঁয় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কাঁচামালের একটি সুগন্ধি চাল। পাইকারি ও খুচরা বাজারের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে চিনিগুঁড়া ও অন্যান্য সুগন্ধি চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পোলাও ও বিরিয়ানি তৈরির খরচে। একইভাবে ডিম, দুধ, চিনি ও ময়দার দাম বাড়ায় বেকারি ও পেস্ট্রিজাতীয় পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয়ও। গ্যাস সরবরাহের সংকটে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে রান্না ও উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়ছে। বিদ্যুৎ, পরিবহন ও জ্বালানির বাড়তি খরচও যোগ হচ্ছে মোট উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে।
চট্টগ্রামভিত্তিক একটি খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ময়দা, চিনি, ভোজ্যতেল, ডিম ও দুধের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এর সঙ্গে গ্যাস সংকট নতুন চাপ তৈরি করেছে। নিয়মিত উৎপাদন চালু রাখতে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে খরচ আরো বাড়ছে। ফলে পণ্যের দাম সমন্বয় করা ছাড়া উপায় থাকছে না।
দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারেও আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে। আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা জানান, সাম্প্রতিক কয়েকটি বৈশ্বিক দুগ্ধপণ্য নিলামে দুধের দাম বেড়েছে। সর্বশেষ ১ সেপ্টেম্বরের নিলামে নন-ফ্যাট দুধের দাম ৫ শতাংশ এবং ফুলক্রিম দুধের দাম ১ শতাংশ বেড়েছে।
খাতুনগঞ্জভিত্তিক আমদানিকারক ও পণ্য মোড়কজাতকারী প্রতিষ্ঠান এমএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বলেন, ‘এক-দুটি বৈশ্বিক নিলামে দুগ্ধজাত কাঁচামালের দাম বাড়লেই দেশের বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে না। তবে ইউরোপে দাবানল ও তীব্র তাপপ্রবাহে উৎপাদন কমে যাওয়ায় টানা তিনটি জিডিটি নিলামে দুধের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও শিপিং খাতের অস্থিরতাও আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে। ফলে শুরুতে দেশের বাজারে দাম অপরিবর্তিত থাকলেও এখন দুগ্ধজাত পণ্যের মূল্য সমন্বয় শুরু হয়েছে।’
প্রস্তুত খাদ্যের দাম বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন নিয়মিত হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভরশীল ভোক্তারা। ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোয় শ্রমজীবী ও কর্মজীবী মানুষের বড় একটি অংশ প্রতিদিনের খাবারের জন্য হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ছোট খাবারের দোকানের ওপর নির্ভর করেন। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে বাইরে থেকে খাবার কেনার ব্যয় তাদের দৈনন্দিন খরচের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চা, চিনি ও দুধের দাম বৃদ্ধির কারণে ফুটপাত ও ছোট খাবারের দোকানেও এর প্রভাব পড়েছে। চা, বিস্কুট, পাউরুটি ও অন্যান্য প্রস্তুত খাবারের দাম কয়েক টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। ফলে একদিকে কাঁচামালের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে প্রস্তুত খাবারের দাম বাড়ার কারণে ভোক্তার ওপর ব্যয়ের চাপ দুই স্তরেই বাড়ছে।
বেকারি ও বড় খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও শুরুতে পণ্যের ওজন কমিয়ে বাড়তি উৎপাদন ব্যয় সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কাঁচামালের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তে থাকায় সেই কৌশলও কার্যকর থাকেনি। এখন ইউনিটপ্রতি দাম বাড়ানোর পথে যাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান।
মেসার্স আল রহমান ফুডসের ব্যবস্থাপক মো. ফজলুল করিম মানিক বলেন, ‘পেস্ট্রিজাতীয় খাবারের পাশাপাশি পোলাও ও বিরিয়ানি তৈরির খরচ আগের তুলনায় ১০-১২ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে সুগন্ধি চাল ও শুকনো ফলের দাম দীর্ঘদিন ধরেই ঊর্ধ্বমুখী। এর সঙ্গে চিনি, ভোজ্যতেল ও ময়দার দামও বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘হোটেল-রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করা খাবারের পরিমাণ কমিয়ে খরচ সমন্বয়ের সুযোগ নেই। তাই লোকসান এড়াতে কিছু পণ্যের দাম বাড়াতে হচ্ছে। তবে দাম বেশি বাড়ালে নিয়মিত ক্রেতারা সরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। সে কারণে ব্যবসায়ীরা যতটা সম্ভব সীমিত পরিসরে মূল্য সমন্বয় করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।’
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, কাঁচামালের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয়ও না কমলে প্রস্তুত খাদ্যের দাম কমানোর সুযোগ সীমিত। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ অব্যাহত থাকলে তার প্রভাব হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি ও অন্যান্য প্রস্তুত খাদ্যপণ্যের বাজারেও আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।![]()