বিমসটেককে কার্যকর বাজারে রূপ দিতে এফটিএ বাস্তবায়নের তাগিদ
বিমসটেকভুক্ত প্রায় ১৭৮ কোটি মানুষের ৫ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে আরও কার্যকর আঞ্চলিক বাজারে পরিণত করতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকেরা। তাদের মতে, বাণিজ্যিক সংহতি জোরদার, আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণ, সরবরাহ শৃঙ্খল উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিমসটেককে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম কার্যকর অর্থনৈতিক জোটে পরিণত করা সম্ভব।
রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) কার্যালয়ে গতকাল অনুষ্ঠিত ‘থ্রি ডিকেডস অব বিমসটেক: অ্যাডভান্সিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর শেয়ারড প্রসপারিটি’ শীর্ষক সেমিনারে এসব মতামত উঠে আসে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিআইআইএসএস। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন বিমসটেকের মহাসচিব ইন্দ্র মণি পান্ডে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি এএনএম মুনিরুজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এএসএম রিদওয়ানুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদুজ্জামান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, তিন দশকের পথচলায় বিমসটেক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের অপরিহার্য প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির আলোকে দেশের জাতীয় স্বার্থই কূটনীতির মূল ভিত্তি। তবে আঞ্চলিক শান্তি, সংযোগ ও সমৃদ্ধির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশের বিমসটেক চেয়ারম্যানশিপের অগ্রাধিকার তুলে ধরে তিনি বলেন, বাস্তবায়ন, অন্তর্ভুক্তি ও ফলাফল—এই তিন নীতিকে সামনে রেখে দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ। দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিমসটেক এফটিএ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় চুক্তিগুলো সম্পন্ন হয়নি উল্লেখ করে তিনি এ বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি পরিবহন সংযোগবিষয়ক মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন, উপকূলীয় নৌ-পরিবহন চুক্তি, জ্বালানি ও ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণ, ব্লু ইকোনমির টেকসই ব্যবহার এবং আঞ্চলিক ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
বিমসটেকের মহাসচিব ইন্দ্র মণি পান্ডে বলেন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক পৃথক ওয়ার্কিং গ্রুপগুলো বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে কাজ করছে এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। শিগগিরই কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্যোগে সদস্য দেশগুলোর বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর জন্য একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রস্তাবের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বিআইপিএসএস সভাপতি এএনএম মুনিরুজ্জামান বলেন, বিমসটেক বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও সামুদ্রিক সহযোগিতার একটি সম্ভাবনাময় প্ল্যাটফর্ম। তিনি সার্ক ও বিমসটেককে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক আঞ্চলিক কাঠামো হিসেবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এএসএম রিদওয়ানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ারম্যান এবং সচিবালয়ের আয়োজক দেশ হওয়ায় সংস্থাটিকে কেবল সম্ভাবনার প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং কার্যকর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক জোটে রূপ দেওয়ার সুযোগ ও দায়িত্ব তৈরি হয়েছে।
মূল প্রবন্ধে ড. মাহফুজ কবির বলেন, ২০০৪ সালে বিমসটেক এফটিএর ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও দুই দশক পরও তা বাস্তবায়িত হয়নি। শুধু বিধিবিধান বিনিময় নয়, পরিচালনাগত আলোচনা, কারিগরি সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট জটিল বিষয়গুলোর সমাধান ছাড়া এফটিএ কার্যকর করা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতির আকারের পার্থক্য, ভৌত ও নিয়ন্ত্রক প্রতিবন্ধকতা, তথ্যের ঘাটতি এবং দুর্বল আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সংযোগ এফটিএ বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য মোট বাণিজ্যের মাত্র ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হলেও সম্ভাবনা অনেক বেশি। আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা, লজিস্টিকস, মানদণ্ড, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা এবং বন্দরে প্রবেশসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদুজ্জামান বলেন, সংযোগ আঞ্চলিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি হলেও এর ভিত্তি নিরাপত্তা। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নিরাপত্তা ও সহযোগিতাকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির পারস্পরিক আন্তঃক্রিয়ার ফল। অবকাঠামো ও নিরাপত্তার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং জনগণের মধ্যে সংযোগ আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা এবং অন্যান্য অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।