বিশ্বজুড়ে ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে আবারও আলোচনায় এসেছে অস্ট্রেলিয়ার কিং আইল্যান্ডের ঐতিহাসিক ডলফিন টাংস্টেন খনি। প্রায় তিন দশক বন্ধ থাকার পর খনিটি পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে ফিরতে যাচ্ছে, আর এ ঘটনাকে ঘিরেই নতুন করে জোরালো হয়েছে বৈশ্বিক যুদ্ধ প্রস্তুতির আলোচনা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্ট এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইতিহাসে লক্ষণীয়ভাবে বড় বড় যুদ্ধের সময়ই ডলফিন খনির কার্যক্রম শুরু বা সম্প্রসারিত হয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, খনি চালু হওয়া মানেই বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে—এমন দাবি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং এটি প্রতিরক্ষা শিল্পে কৌশলগত খনিজের বাড়তে থাকা চাহিদার প্রতিফলন।
ডলফিন মাইনকে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ টাংস্টেন ভাণ্ডার হিসেবে ধরা হয়। টাংস্টেন অত্যন্ত কঠিন, ঘন এবং উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল ধাতু। এ কারণে বর্ম-ভেদী গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ, সাঁজোয়া যান, যুদ্ধবিমান এবং শিল্পকারখানার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কাটিং টুল তৈরিতে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
খনিটির ইতিহাসও বেশ নাটকীয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অস্ত্র উৎপাদনের চাহিদা মেটাতে ১৯১৭ সালে এটি চালু হয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বাজারে টাংস্টেনের দাম কমে গেলে ১৯২০ সালে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৩৮ সালে আবার উৎপাদন শুরু হয়। পরে কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালেও বিভিন্ন সময়ে খনিটি চালু ছিল। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর পতন ও স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর এটি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২২ সালের জানুয়ারিতে খনিটি পুনরুজ্জীবনের কাজ শুরু হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করলে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বৈশ্বিক বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেয়। এখন ২০২৬ সালে এসে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ভূগর্ভ থেকে প্রথম আকরিক উত্তোলন ও বাণিজ্যিক সরবরাহ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
টাংস্টেনকে ঘিরে প্রতিযোগিতার আরেকটি বড় কারণ হলো চীনের আধিপত্য। বৈশ্বিক টাংস্টেন উৎপাদনের বড় অংশই চীন নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং তাদের মিত্র দেশগুলো প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহ শৃঙ্খল নিরাপদ করতে বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে চাইছে। তাই ডলফিন খনির পুনরায় চালু হওয়াকে শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়, বরং কৌশলগত নিরাপত্তা উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কাজাখস্তানের একটি বৃহৎ অব্যবহৃত টাংস্টেন ভাণ্ডার উন্নয়নে প্রায় ১৬০ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে। এর লক্ষ্যও একই—চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ডলফিন খনির পুনরায় চালু হওয়া আসন্ন বিশ্বযুদ্ধের নিশ্চিত সংকেত নয়। তবে এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে, বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের কথা মাথায় রেখে অস্ত্রশিল্প ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দৌড়ে নেমেছে। টাংস্টেন তাই এখন শুধু একটি শিল্পধাতু নয়, বৈশ্বিক ভূরাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ।