স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণকে সামনে রেখে আগামী তিন বছরে বাস্তবায়নের জন্য সরকার বেশকিছু প্যারামিটার নির্ধারণ করেছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নে বেসরকারি খাতের পরামর্শকে গুরুত্ব দেয়া হবে বলে জানান তিনি।
রাজধানীর মতিঝিলে গতকাল ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) কার্যালয়ে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর সংশোধনীর খসড়া নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনকে সামনে রেখে আগামী তিন বছরে বাস্তবায়নের জন্য বেশকিছু প্যারামিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব কাজের জন্য কী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে এবং কতটা বিস্তৃতভাবে কাজ করতে হবে, সে বিষয়েও সরকারকে ভাবতে হচ্ছে। কোম্পানি আইন সংশোধন সেই বিপুলসংখ্যক কাজের মধ্যে একটি উপাদান মাত্র।’
কোম্পানি আইনকে সময়োপযোগী করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৯৪ সালে আইনটি প্রণয়নের পর মাত্র দুটি ছোটখাটো সংস্কার হয়েছে। ফলে বর্তমান ব্যবসায়িক বাস্তবতা ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনটি আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৯৪ সালের পর কোম্পানি আইনে মাত্র দুটি ছোটখাটো সংস্কার হয়েছে। এখন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনটিকে যুগোপযোগী করতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ম ও পদ্ধতি সহজ করতে বিশ্বের যেসব দেশে আইন ও বিধিবিধান ভালোভাবে কার্যকর হচ্ছে, সেসব দেশের উদাহরণ নেয়া যেতে পারে।’
অন্যান্য দেশে কোম্পানি-সংক্রান্ত আইন কীভাবে কার্যকর হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করে ব্যবসায়ীদের নিজেদের প্রস্তাব দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সংশোধনী প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়া না করে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেন।
খসড়া সংশোধনী নিয়ে মতামত দেয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের পর্যাপ্ত সময় দেয়া হবে বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা দরকার। তারা ৩০ দিন সময় চেয়েছেন, প্রয়োজন হলে আরো বেশি সময় নেয়া যেতে পারে। তবে দিন শেষে ভালো প্রস্তাব নিয়ে আসা দরকার।’
তিনি আরো বলেন, ‘অন্যান্য দেশে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো কীভাবে কার্যকর হচ্ছে, তা তুলনা করে দেখতে হবে। এরপর ব্যবসায়ীদের পরামর্শের ভিত্তিতেই এমন একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করা হবে, যা ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে।’
ভবিষ্যতের সংস্কার কার্যক্রমেও ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা অব্যাহত রাখার কথা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তার ভাষায়, ‘ভবিষ্যতে যেসব পরিবর্তন আনা হবে, সেগুলোর প্রতিটিতেই ব্যবসায়ী মহলের পরামর্শ প্রয়োজন হবে। সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়েই এসব পরিবর্তন আনতে চায়।’
সভায় কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্দেশ্য, প্রস্তাবিত পরিবর্তন ও এর যৌক্তিকতা তুলে ধরে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার। বেসরকারি খাতের পক্ষে প্রস্তাব উপস্থাপন করেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবির।
সভায় জানানো হয়, কোম্পানি আইনের সার্বিক আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরির লক্ষ্যে পাঁচটি কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ তৈরি, তথ্যপ্রযুক্তির সর্বাত্মক ব্যবহার নিশ্চিত করা, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার আইনি ভিত্তি তৈরি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা।
খসড়া সংশোধনী নিয়ে আলোচনায় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে ৫০ কোটি টাকার বেশি আয় করা প্রতিষ্ঠানগুলোয় কোম্পানি সচিব নিয়োগ এবং বার্ষিক সাধারণ সভার তারিখ ঘোষণার ক্ষেত্রে ন্যূনতম সময়সীমা ২১ দিন থেকে কমিয়ে ১৪ দিন করার প্রস্তাব উল্লেখযোগ্য।
কোম্পানি আইন সংশোধনের আগে বেসরকারি খাতের সঙ্গে মতবিনিময়কে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘অতীতে দেখেছি বেসরকারি খাতের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই পলিসি নেয়া হতো। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে কোম্পানি আইন হলো মূল আইন, এর ওপর অন্য কোনো আইন প্রাধান্য পাওয়া উচিত নয়।’
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকের সভাপতিত্বে সভায় মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধক মো. নূর-ই-আলম, এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ, ট্রান্সকমের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, এমসিসিআইয়ের সভাপতি কামরান টি. রহমান, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী এবং বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল হকসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা।![]()