স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা অধিগ্রহণে আগ্রহ দেখানো চারটি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে তিনটি ব্যাংকের এনডিএ (গোপনীয়তা রক্ষা চুক্তি) সইয়ের প্রক্রিয়া পিছিয়ে গেছে। ব্যবসাটির সঙ্গে প্রায় দেড় হাজার কর্মীও অধিগ্রহণ করতে হবে—স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এমন শর্তই সম্ভাব্য ক্রেতাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির উদ্যোগের অংশ হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংককে (এমটিবি) এনডিএ সইয়ের প্রস্তাব দিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ। এর মধ্যে শুধু সিটি ব্যাংক এনডিএ সই করেছে। বাকি তিন ব্যাংক এখনো প্রস্তাব ও শর্তগুলো পর্যালোচনা করছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের ভাষ্য, মূল সমস্যা কর্মীদের বেতন-ভাতা নিয়ে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিংয়ে কর্মরত প্রায় দেড় হাজার কর্মীকে একসঙ্গে নেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এসব কর্মীর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকলেও তাদের বেতন-ভাতা স্থানীয় ব্যাংকগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে তাদের অধিগ্রহণের পর রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।
এতে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সামনে আরেকটি সমস্যা তৈরি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ বেতন কাঠামো নিয়ে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড থেকে আসা কর্মীদের তুলনামূলক বেশি বেতন-ভাতা বহাল রাখলে নতুন ব্যাংকের বিদ্যমান কর্মীদের সঙ্গে বেতন বৈষম্য তৈরি হতে পারে। আবার পুরো কর্মীবাহিনীর বেতন কাঠামো সমন্বয় করতে গেলে ব্যয় আরও বাড়বে। ফলে ব্যবসাটির মূল্যায়নের পাশাপাশি কর্মী ব্যয় ও ভবিষ্যৎ লাভজনকতাও হিসাব করছেন সম্ভাব্য ক্রেতারা।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, তারা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের রিটেইল ব্যাংকিং অধিগ্রহণে আগ্রহী। তবে দেড় হাজার কর্মীকে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও পূবালী ব্যাংকের বেতন কাঠামো এক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তাদের পর্ষদে আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো অধিগ্রহণের বিষয়ে তারা ইতিবাচক।
এদিকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের রিটেইল ব্যাংকিং অধিগ্রহণের বিষয়ে এমটিবিকেও এনডিএ সইয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এমটিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, কয়েকটি ব্যাংক এ ধরনের প্রস্তাব পেয়েছে। তবে অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশে ১২০ বছরের বেশি সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা, যা ওই বছর দেশের ব্যাংক খাতে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৪ সালে ব্যাংকটি ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল।
বিশ্বের বিভিন্ন ছোট অর্থনীতির বাজারে ব্যবসা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড কয়েক বছর ধরে কিছু দেশে রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে বা বিক্রি করছে। বাংলাদেশেও চলতি বছরের জুলাইয়ে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড তাদের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির আগ্রহের কথা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। কোন ব্যাংক কী শর্তে ব্যবসাটি কিনবে, সেটি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিষয় বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কর্মীদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজর থাকবে।
২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের রিটেইল ব্যাংকিং ঋণের স্থিতি ছিল ৬ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তিগত ঋণ ৩ হাজার ৩৪৯ কোটি, ক্রেডিট কার্ড ১ হাজার ৬৯ কোটি, মর্টগেজ ঋণ ৯৫১ কোটি এবং স্টাফ লোন ৩৩১ কোটি টাকা। রিটেইল ব্যাংকিংয়ে ব্যাংকটির আমানত প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা বলে জানা গেছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটপী দাশ চৌধুরী অবশ্য রিটেইল ব্যাংকিং বিক্রির বিষয়টিকে বাজারের গুঞ্জন ও জল্পনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং ব্যাংকিং সেবা ও কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাঁর ভাষ্য, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড গ্রুপ নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক মডেলের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ ও মনোযোগ পুনর্বিন্যাস করে।![]()