ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি আদিল চৌধুরীর পদত্যাগ
আর্থিক সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আদিল চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে তিনি ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ব্যক্তিগত কারণ উল্লেখ করে দেওয়া এ পদত্যাগপত্রের পর থেকে তিনি নিয়মিত অফিসেও যাচ্ছেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ন্যাশনাল ব্যাংকের একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ বা দায়িত্ব হস্তান্তর বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
গত বছরের ৭ জুলাই তিন বছরের চুক্তিতে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন আদিল চৌধুরী। দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকটি ইতোমধ্যেই উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন সংকট এবং তারল্য চাপে ছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে ব্যাংকটিকে ঘুরে দাঁড় করানোর লক্ষ্যেই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে মেয়াদের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করলেন।
এর আগে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন মো. তৌহিদুল আলম খান। তিনিও নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছিলেন। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী দায়িত্ব ছাড়লেন।
ন্যাশনাল ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগে আদিল চৌধুরী ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই ব্যাংকারকে সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংকের পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তার পদত্যাগের সময় ব্যাংকটি এখনো গভীর আর্থিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের উচ্চ খেলাপি ঋণ, ধারাবাহিক লোকসান এবং আমানত প্রত্যাহারের চাপ ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে তুলেছে। পাশাপাশি মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকটও ব্যাংকটির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে টানা লোকসান করছে ন্যাশনাল ব্যাংক। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং অতীতের বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের কারণে ব্যাংকটির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে ব্যাংকটির পুনর্গঠন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংককে রাজধানীর পান্থপথে নির্মাণাধীন ‘টুইন টাওয়ার’ ভবন ইজারা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এক সময় ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনায় সিকদার গ্রুপের প্রভাব ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দীর্ঘদিন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণে ছিল গ্রুপটি। তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপের পর সিকদার গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ হারায়।
পরবর্তীতে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। বর্তমানে মাল্টিমোড গ্রুপ, হোসাফ গ্রুপ এবং আর্মানা গ্রুপের পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকটির পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, ন্যাশনাল ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমের অগ্রগতি আগামী দিনগুলোতে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, মূলধন ঘাটতি কমানো, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং মুনাফায় ফেরাই হবে নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।