মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড
বাংলাদেশের নির্মাণ খাত দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। নির্মাণসামগ্রীর মানোন্নয়ন, উৎপাদন প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং দেশীয় প্রকৌশলীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে বড় ও জটিল অবকাঠামো নির্মাণে দেশের সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। উন্নতমানের রড থেকে শুরু করে আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি—সব মিলিয়ে নির্মাণ খাত এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয় রসদ দেশেই পাওয়া যাচ্ছে।
জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন এবং প্রকৌশল সক্ষমতাও ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে।
তার মতে, নির্মাণ খাতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের পরিবর্তনের মাধ্যমে। স্থাপনার নকশা তৈরির সময় প্রকৌশলীরা আগে দেশে কী ধরনের নির্মাণসামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করতেন। ফলে যে মানের রড বা অন্যান্য উপকরণ সহজলভ্য ছিল, সেটিকে বিবেচনায় রেখেই নকশা করা হতো।
“আগে যেমন ৫০০ শক্তির রড পাওয়া যেত, তখন সেটাকে ভিত্তি করেই নকশা করা হতো। এখন ৬০০ শক্তির রড এসেছে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে এখন ৬০০ শক্তির রড ব্যবহার করে নকশাও হচ্ছে। এভাবেই ধাপে ধাপে সক্ষমতা বাড়ছে,” বলেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম।
উৎপাদন প্রযুক্তিতেও পরিবর্তন
শুধু নির্মাণের নকশা নয়, নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনের প্রযুক্তিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দেশের ইস্পাত খাত ক্রমেই আধুনিক প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইনডাকশন ফার্নেসের পাশাপাশি ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসের মতো আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় উৎপাদনের সক্ষমতা ও মানোন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ইনডাকশন ফার্নেসে যারা উৎপাদন করছেন, তারাও মানের ক্ষেত্রে আরো উন্নতির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরপর ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস এসেছে। প্রযুক্তির এ পরিবর্তন নির্মাণ খাতের সক্ষমতাকেও এগিয়ে নিচ্ছে।”
তার মতে, আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু ইস্পাতের মান উন্নত করছে না; বরং দেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয় মানের নির্মাণসামগ্রী দেশেই উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করছে।
বড় অবকাঠামো প্রকল্পে প্রযুক্তির প্রভাব
দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বড় বড় সেতু, টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে ও গণপরিবহন অবকাঠামো নির্মাণে যে ধরনের উপকরণ প্রয়োজন হচ্ছে, সেগুলোর মানও আগের তুলনায় অনেক বেশি।
এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বর্তমানে যে তিনটি এমআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে, সেগুলোর জন্য গত সেপ্টেম্বরে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেয়া হয়েছে। সেখানে যে রড ব্যবহার করা হবে, সেটি ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসের রড হতে হবে।”
তিনি বলেন, বিকল্প হিসেবে ওপেন হার্ট বা অক্সিজেন ফার্নেসে উৎপাদিত রড ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বাংলাদেশে ওপেন হার্ট বা অক্সিজেন ফার্নেস নেই। ফলে দেশে ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসের সক্ষমতা তৈরি হওয়ায় আধুনিক অবকাঠামো প্রকল্পে এ প্রযুক্তিতে উৎপাদিত রড ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
“অর্থাৎ যখন যে হালনাগাদ প্রযুক্তি আসছে, তার সঙ্গে মিল রেখে আমাদের নকশা ও নির্মাণ পদ্ধতিও পরিবর্তিত হচ্ছে,” বলেন তিনি।
আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণ সক্ষমতা তৈরি হয়েছে
বাংলাদেশে এখন আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণকাজ করার সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
তার ভাষায়, দেশের স্থপতি ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের দক্ষতা আগের তুলনায় বেড়েছে। পাশাপাশি নির্মাণের ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতাতেও পরিবর্তন এসেছে।
“বাংলাদেশে এখন মানসম্পন্ন নির্মাণসামগ্রীও তৈরি হচ্ছে, আবার মানসম্পন্ন নির্মাণকাজও হচ্ছে। আমাদের স্থপতি ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের দক্ষতা বেড়েছে, তাদের মানসিকতাতেও পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণ করার মতো প্রয়োজনীয় রসদ এখন বাংলাদেশেই রয়েছে,” বলেন তিনি।
তিনি বলেন, “শুধু বড় ভবন নয়, বড় বড় সেতু, কালভার্ট, টানেল ও এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি হচ্ছে। এসব অবকাঠামো নির্মাণে যে পরিমাণ ও ধরনের নির্মাণসামগ্রী প্রয়োজন, সেগুলোও বাংলাদেশে ভালোভাবেই উৎপাদিত হচ্ছে।”
সক্ষমতা বাড়লেও রফতানিতে বাধা উৎপাদন ব্যয়
নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পরিসরে রফতানি এখনো চ্যালেঞ্জের। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা এবং তুলনামূলক বেশি উৎপাদন ব্যয়।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বাড়লে বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। রড ও সিমেন্ট—উভয় ক্ষেত্রেই কাঁচামালের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে পণ্যের সঙ্গে অতিরিক্ত ফ্রেইট খরচ যুক্ত হয়। এর পাশাপাশি রয়েছে কাস্টমসের বড় শুল্ক কাঠামো।
“আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান তৈরি করতে হলে এসব অনেক কিছু পরিবর্তন করতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো অর্থায়ন কাঠামো,” বলেন তিনি।
ঋণের উচ্চ খরচে চাপ বাড়ছে উদ্যোক্তাদের
বাংলাদেশের শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে অর্থায়ন কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
একটি শিল্প স্থাপনের উদাহরণ দিয়ে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ধরুন, ১ হাজার কোটি টাকা দিয়ে একটি শিল্প স্থাপন করা হবে। এর ৩০ শতাংশ বা ৩০০ কোটি টাকা উদ্যোক্তাকে ইকুইটি হিসেবে দিতে হচ্ছে। বাকি ৭০০ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে।
কিন্তু শিল্পকারখানা স্থাপনের পর উৎপাদনে যেতে সময় লাগে। অন্যদিকে ব্যাংকঋণের সুদ ও কিস্তির চাপ শুরু হয় দ্রুতই।
“এখন এই ৭০০ কোটি টাকা ঋণ পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। অথচ একটি কারখানা স্থাপন করে উৎপাদনে যেতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লেগে যায়। ৭০০ কোটি টাকার ঋণের ওপর প্রথম বছরেই যদি ১২ শতাংশ সুদ দিতে হয়, তাহলে প্রায় ৮৪ কোটি টাকা সুদ আসে। এরপর প্রতি বছর বড় অঙ্কের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়,” বলেন তিনি।
তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি ঋণ পরিশোধের কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে উদ্যোক্তার ওপর শুরুতেই বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয় এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
পুঁজিবাজারের ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজন
বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকা দেশগুলোর অর্থায়ন কাঠামোর দিকে তাকালে বড় পার্থক্য দেখা যায় বলে মনে করেন তিনি। ভারত, চীন ও জাপানের মতো দেশে শিল্প উদ্যোক্তারা শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করেন না; পুঁজিবাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পান।
“ফলে প্রতি বছর কিস্তি ও সুদের যে চাপ, সেটা উদ্যোক্তাকে একইভাবে বহন করতে হয় না। উদ্যোক্তা যে মুনাফা করছেন, তার একটি অংশ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ভাগ করছেন। ফলে তাদের উৎপাদন ব্যয় কম পড়ে। তাহলে তাদের সঙ্গে আমি বিশ্ববাজারে কীভাবে প্রতিযোগিতা করব?”—প্রশ্ন রাখেন তিনি।
তার মতে, বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয়কে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করে দেখতে হবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্যোক্তাদের নীতিগত ও আর্থিক সুবিধা দিতে হবে। তবেই আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের শিল্পপণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
রফতানি প্রণোদনার অভিজ্ঞতা
রফতানি প্রণোদনার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জানান, একসময় বাংলাদেশ থেকে বিলেট রফতানির ক্ষেত্রে ইনসেনটিভ পাওয়া যেত। এ ধরনের নীতিগত সহায়তার ওপর ভিত্তি করেই রফতানির পরিকল্পনা করেছিলেন উদ্যোক্তারা।
“আমরা যখন বিলেট রফতানি করেছিলাম, তখন ইনসেনটিভ পাওয়া যেত। গার্মেন্টস খাতও এভাবেই বড় হয়েছে এবং এখনো রফতানিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল ১৫ শতাংশ ক্যাশ ইনসেনটিভ পাব। সেটাকে ভিত্তি করেই প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে সেটা ৪ শতাংশ চূড়ান্ত হয়। ফলে এ রফতানি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি,” বলেন তিনি।
তার বক্তব্যে স্পষ্ট, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই হবে না; প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিগত সহায়তাও প্রয়োজন।
রিজার্ভ ও রফতানি বাড়ার পর এখন নজর মানবসম্পদে
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতি হয়েছে উল্লেখ করে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, একসময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে ছিল। বর্তমানে তা প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ব্যালান্স অব পেমেন্টের অবস্থাও ভালো হয়েছে। রফতানি ও রেমিট্যান্স—দুটিই বেড়েছে।
তবে তার মতে, অর্থনীতির এ অগ্রগতিকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে।
“এখন আমাদের পরবর্তী কাজ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। শিল্পে প্রযুক্তি আসছে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হলে দক্ষ মানুষ প্রয়োজন। তাই দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।”
প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও দক্ষতার সমন্বয়
বাংলাদেশের নির্মাণ ও ইস্পাত খাতের সামনে তাই একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি, উন্নতমানের নির্মাণসামগ্রী এবং দেশীয় প্রকৌশলীদের দক্ষতা দেশের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়, আমদানিনির্ভর কাঁচামাল, শুল্ক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ শিল্পের সম্প্রসারণকে কঠিন করে তুলছে।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের মতে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে যদি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ, কার্যকর রফতানি নীতি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে সমন্বিত করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের নির্মাণসামগ্রী ও ইস্পাত শিল্প শুধু দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের চাহিদা পূরণেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
![]()