বাংলাদেশকে শুধু বাজার নয়, নির্ভরযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে: সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল
সভাপতি, অ্যামচাম
রাজু আলীম
বাংলাদেশে বহুজাতিক করপোরেট নেতৃত্ব, ডিজিটাল পেমেন্ট খাত এবং বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনায় পরিচিত একটি নাম সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বৈশ্বিক পেমেন্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি সম্প্রতি আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)-এর সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তার এই দায়িত্ব গ্রহণ এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নশীল দেশ থেকে উত্তরণের নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।
সৈয়দ মোহাম্মদ কামালের জন্ম ঢাকায় হলেও তার বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে। পরে চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে কানাডার রয়্যাল রোডস ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবসা প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি করপোরেট খাতে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে বিক্রয়, বিপণন ও ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেন।
তার কর্মজীবনের শুরু হয় এসিআই কনজিউমার ব্র্যান্ডসে। পরে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি বিপণন, বিক্রয় ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণ কার্যক্রমে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। করপোরেট জগতে তার নেতৃত্বগুণ এবং কৌশলগত চিন্তাভাবনার পরিচয় তখন থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দুই হাজার পাঁচ সালে তিনি আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নে যোগ দেন। সেখানে কাজ করার সময় তিনি রেমিট্যান্স খাত, আন্তর্জাতিক আর্থিক সেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে তার আগ্রহও এই সময় আরও গভীর হয়।
দুই হাজার তেরো সালে তিনি মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিকাশে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তার নেতৃত্বে মাস্টারকার্ড বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাত, কার্ডভিত্তিক লেনদেন, ই-কমার্স এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তরের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন।
করপোরেট দায়িত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত রয়েছেন। তিনি ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া অ্যামচেমের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বে সক্রিয় ছিলেন। দীর্ঘদিনের এই সম্পৃক্ততার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি সংগঠনটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
অ্যামচেমের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য শুধু কর সুবিধা নয়, বরং সহজ ব্যবসা পরিবেশ, নীতিগত স্থিতিশীলতা, দক্ষ অবকাঠামো এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস প্রয়োজন। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের জ্বালানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল অর্থনীতি, ভোগ্যপণ্য এবং লজিস্টিকস খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
তিনি মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগের গুরুত্ব শুধু মূলধন প্রবাহে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসায়িক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি পূর্বানুমানযোগ্য এবং স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক বাজেট ও অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে আলোচনাতেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। অ্যামচেমের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সুপারিশ সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে কর কাঠামোর সংস্কার, ডিজিটাল পেমেন্টে উৎসাহ প্রদান, লজিস্টিকস নীতিমালার বাস্তবায়ন এবং ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা কমানোর বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য।
বর্তমানে তিনি এমন এক সময়ে অ্যামচেমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যখন বাংলাদেশ নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। করপোরেট খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ডিজিটাল অর্থনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তাকে এই দায়িত্ব পালনে বিশেষভাবে সহায়তা করবে বলে ব্যবসায়িক মহল মনে করে।
অ্যামচেমের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল যে বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, তা হলো বাংলাদেশকে একটি নির্ভরযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তার মতে, বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু বাজারের আকার দেখেন না; তারা দেখেন নীতিগত স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, ব্যবসা পরিচালনার সহজতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুযোগ। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসঙ্গে সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বরাবরই আশাবাদী। তার মতে, গত এক দশকে বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার যে বিস্তার ঘটেছে, তা দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মোবাইল আর্থিক সেবা, অনলাইন লেনদেন, ই-কমার্স এবং কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে। তবে তিনি মনে করেন, এখনও দেশের বড় একটি অংশ নগদ অর্থনির্ভর। ফলে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করতে সরকার, ব্যাংক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তার বক্তব্যে প্রায়ই একটি বিষয় উঠে আসে ডিজিটাল পেমেন্ট শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিরও বিষয়। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক কিংবা গ্রামের একজন সাধারণ নাগরিক যদি সহজে ও নিরাপদে ডিজিটাল লেনদেন করতে পারেন, তাহলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। এ কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণের পক্ষে কথা বলে আসছেন।
করপোরেট জগতে সহকর্মীরা তাকে একজন ফলাফলমুখী এবং অংশগ্রহণমূলক নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে দলগত মতামতকে মূল্যায়ন করেন। তার বিশ্বাস, একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কোনো একক ব্যক্তির অর্জন নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল। এই দর্শন তিনি কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে অনুসরণ করেছেন।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে তিনি কয়েকটি চ্যালেঞ্জের কথাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, ব্যবসা পরিচালনায় প্রশাসনিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং আমলাতান্ত্রিক বাধা এখনও বড় সমস্যা। বিনিয়োগকারীরা শুধু কর-সুবিধা দেখেন না; তারা দেখেন একটি দেশে ব্যবসা পরিচালনা কতটা সহজ। তাই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে নীতিগত স্থিতিশীলতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অ্যামচেমের নতুন নির্বাহী কমিটির জন্যও তিনি একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তার মতে, সংগঠনটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থ সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং গবেষণা, নীতিগত সুপারিশ এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠন ও বৈশ্বিক অ্যামচেম নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল মনে করেন, আগামী দশক বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরের এই সময়ে সঠিক নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ আরও বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। তবে সেই যাত্রায় বেসরকারি খাত, বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং সরকারের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিন দশকের বেশি সময়ের করপোরেট অভিজ্ঞতায় তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন পর্যায়ের পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন। ভোক্তা পণ্য খাত থেকে আর্থিক সেবা, আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর থেকে ডিজিটাল পেমেন্ট—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি পরিবর্তনের অংশ ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সৈয়দ মোহাম্মদ কামালের কর্মজীবন শুধু একজন করপোরেট নির্বাহীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির উত্থান এবং বৈশ্বিক ব্যবসায়িক সংযোগের একটি প্রতিচ্ছবিও বটে। তিনি বিদেশি বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার অন্যতম পরিচিত মুখ। অ্যামচেমের বর্তমান সভাপতি হিসেবে তার সামনে যেমন নতুন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাংলাদেশকে আরও বেশি বিনিয়োগবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করার সুযোগ। সেই লক্ষ্য পূরণে তার অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই ব্যবসায়িক মহলের প্রত্যাশা।
রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব