মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে তারুণ্য, অনিশ্চিত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
প্রফেসর ড. মোহাঃ হাছানাত আলী
উপাচার্য
নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়
একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার যুবসমাজ। নদী যেমন তার উৎস থেকে শক্তি পায়, একটি রাষ্ট্রও তেমনি তারুণ্যের প্রাণশক্তি থেকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন নির্মাণ করে। কিন্তু যখন সেই তারুণ্যের শিরায় রক্তের পরিবর্তে প্রবাহিত হতে শুরু করে বিষ, যখন স্বপ্নের জায়গা দখল করে নেয় নেশার অন্ধকার, তখন শুধু একজন মানুষ নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি পরিবার, একটি সমাজ, একটি রাষ্ট্র, এমনকি একটি জাতির ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশ আজ এমন এক নীরব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যার বিস্তার দৃশ্যমান হলেও প্রতিকার এখনো পর্যাপ্ত নয়। মাদকের ভয়াল থাবা আজ সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে গেছে গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত জনপদে, শহরের অলিগলিতে, স্কুল-কলেজের শ্রেণিকক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে, এমনকি শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের অন্দরমহলেও। নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরী, ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমিক, চাকরিজীবী—কেউই এই ভয়াবহতার বাইরে নেই।
প্রশ্ন হলো, এই মাদক কোথা থেকে আসছে? কারা তৈরি করছে? কারা এর পৃষ্ঠপোষক? এবং কেন বাংলাদেশের মতো একটি দেশকে মাদকের বাজার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একদিকে আশীর্বাদ, অন্যদিকে অভিশাপ। ভারত ও মায়ানমারের দীর্ঘ সীমান্তঘেঁষা অবস্থান বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করলেও একই সঙ্গে সৃষ্টি করেছে মাদক চোরাচালানের ভয়ংকর করিডর। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবা, আইস, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকের একটি বড় অংশ আসে সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে। বিশেষত মায়ানমারের সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে অবৈধ মাদক উৎপাদন বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ। অপরদিকে ভারতের কিছু সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের অবৈধ উৎপাদন ও পাচার দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব মাদকের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের গন্তব্য বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বিশাল যুব জনগোষ্ঠী, সীমান্তের দুর্বলতা, দ্রুত নগরায়ণ এবং সামাজিক অবক্ষয়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটগুলো একটি লাভজনক বাজার তৈরি করেছে। প্রশ্ন হলো
বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে ঢুকছে মাদক?
প্রতিবার বড় চালান ধরা পড়লে সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়। হাজার হাজার ইয়াবা উদ্ধার, কোটি টাকার মাদক জব্দ, চোরাকারবারি আটক—এসব খবর প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু একটি প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে থেকেই যায়—যদি এত মাদক ধরা পড়ে, তবে যে বিপুল পরিমাণ মাদক বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে, তা কোথা দিয়ে আসছে?
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত প্রায় ৪,১০০ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত প্রায় ২৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ। নদী, পাহাড়, বনাঞ্চল, চর ও দুর্গম জনপদের বিস্তৃত এই সীমান্ত শতভাগ নজরদারির আওতায় রাখা অত্যন্ত কঠিন। চোরাকারবারিরা এখন আর শুধু রাতের অন্ধকার ব্যবহার করে না। তারা প্রযুক্তি ব্যবহার করে, স্থানীয় দালালচক্র ব্যবহার করে, এমনকি কখনো কখনো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের সহায়তাও গ্রহণ করে। গরু, পণ্য কিংবা বৈধ বাণিজ্যিক চালানের আড়ালেও মাদক ঢুকে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বাস্তবতায় শুধু বিজিবিকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং প্রশ্ন করতে হবে—সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কতটা আধুনিক? নজরদারি প্রযুক্তি কতটা কার্যকর? গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান কতটা শক্তিশালী? এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে?
বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ডসহ একাধিক সংস্থা মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবুও মাদকের বিস্তার কমছে না—এটি বাস্তবতা।
কারণ শুধু মাদক উদ্ধার করাই সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। প্রকৃত সাফল্য হবে যখন নতুন আসক্তের সংখ্যা কমবে, পুনর্বাসিত মানুষের সংখ্যা বাড়বে এবং মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস হবে। দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে অভিযান-কেন্দ্রিক কার্যক্রমকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে মাদক ব্যবসার মূল হোতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর আইনের আওতায় আসে নিম্নস্তরের বাহকরা।
স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়: অন্ধকারের বিস্তার
একসময় মাদককে সমাজের প্রান্তিক সমস্যারূপে দেখা হতো। এখন আর সেই সুযোগ নেই। বর্তমানে দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে গড়ে উঠেছে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক। বন্ধুত্ব, কৌতূহল, হতাশা, প্রেমে ব্যর্থতা, বেকারত্ব, সামাজিক চাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব অনেক তরুণকে নেশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মেডিকেল কলেজের ছাত্র, এমনকি স্কুলপড়ুয়া কিশোরদের মধ্যেও মাদকাসক্তির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অনেক পরিবার বিষয়টি জানতে পারে তখনই, যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন মাদকাসক্তিকে পুরুষকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে।
নগরায়ণ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ, পারিবারিক ভাঙন এবং অনলাইন সংস্কৃতির প্রভাবে নারী ও কিশোরীদের মধ্যেও মাদকাসক্তির প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ নারী আসক্তদের জন্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা এখনো অত্যন্ত সীমিত। ফলে তারা দ্বিগুণ সংকটের মুখোমুখি হয়—একদিকে আসক্তি, অন্যদিকে সামাজিক কলঙ্ক। মাদক একটি আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। তাই এককভাবে কোনো দেশ এই সমস্যার সমাধান করতে পারে না। বাংলাদেশ বারবার সীমান্তবর্তী মাদক উৎপাদন ও পাচার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যৌথ অভিযান, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। কারণ মাদক ব্যবসা এখন শুধু অপরাধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক অর্থপাচার, অস্ত্র চোরাচালান এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
মাদক সমস্যার সমাধান শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়। এটি একটি জাতীয় সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। প্রথমত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ড্রোন, সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। তৃতীয়ত, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক মাদকবিরোধী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে। চতুর্থত, পরিবারকে সচেতন হতে হবে। সন্তানের পরিবর্তিত আচরণ, বন্ধু নির্বাচন, অনলাইন কার্যক্রম এবং মানসিক অবস্থার প্রতি অভিভাবকদের আরও মনোযোগী হতে হবে।
পঞ্চমত, পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোকে মানবিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সহজলভ্য করতে হবে। আসক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী নয়, চিকিৎসাপ্রার্থী নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে।
ষষ্ঠত, মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক শিকড় ধ্বংস করতে অর্থপাচার, অবৈধ সম্পদ ও গডফাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
মাদক শুধু একটি পাউডার নয়, একটি ট্যাবলেট নয়, একটি বোতল নয়। মাদক আসলে একটি নীরব যুদ্ধ। এই যুদ্ধে প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য স্বপ্ন, ভেঙে যাচ্ছে পরিবার, নিভে যাচ্ছে সম্ভাবনার প্রদীপ।
আজ যদি আমরা নীরব থাকি, তাহলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই ব্যর্থ হয়, যখন তার যুবসমাজ ভবিষ্যৎ নির্মাণের পরিবর্তে আত্মবিনাশের পথে হাঁটতে শুরু করে। বাংলাদেশের সামনে এখনো সময় আছে। কিন্তু সেই সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তের কাঁটাতার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, আদালতের রায় কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্য—কোনোটিই একা এই সংকটের সমাধান করতে পারবে না। প্রয়োজন রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং নাগরিকদের সম্মিলিত জাগরণ। কারণ মাদকবিরোধী লড়াই মূলত একটি জাতিকে রক্ষার লড়াই—একটি ভবিষ্যৎকে রক্ষার লড়াই। যে দিন বাংলাদেশের প্রতিটি তরুণ মাদকের পরিবর্তে স্বপ্নকে বেছে নেবে, সেদিনই সত্যিকার অর্থে বিজয়ী হবে বাংলাদেশ।
প্রফেসর ড. মোহাঃ হাছানাত আলী
উপাচার্য
নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়