মানুষের আস্থাই এসএমসির সবচেয়ে বড় শক্তি: সায়েফ নাসির
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড
রাজু আলীম
বাংলাদেশে একসময় ডায়রিয়া মানেই ছিল আতঙ্ক। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি ছিল প্রাণঘাতী রোগ। বিশুদ্ধ পানির সংকট, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থার অভাবে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হতো পানিশূন্যতায়। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি বদলে দিতে সবচেয়ে কার্যকর যে উদ্ভাবনগুলোর একটি ভূমিকা রেখেছে, সেটি হলো প্যাকেটজাত ওরস্যালাইন। আর এই ওরস্যালাইনকে দেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে জনস্বাস্থ্যে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি (এসএমসি)।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ও সরবরাহের মাধ্যমে এসএমসি আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওরাল রিহাইড্রেশন সল্যুশন (ওআরএস) উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বছরে প্রায় ১২০ কোটি প্যাকেট উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দেশের মোট চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি পূরণ করছে। তবে এই সাফল্যের পেছনে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা নয়, মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও আস্থাকেই সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করেন এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েফ নাসির।
তিনি বলেন, এসএমসির সাফল্য কোনো একদিনে আসেনি। প্রায় পাঁচ দশক ধরে মানুষের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠানটি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। মানুষের সেই বিশ্বাসই এসএমসির সবচেয়ে বড় সম্পদ।
সায়েফ নাসির বলেন, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে ডায়রিয়া ও পানিস্বল্পতায় শিশু মৃত্যুর হার ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সে সময় ঘরে তৈরি স্যালাইন ব্যবহারের জন্য ‘এক মুঠো গুড়, এক চিমটি লবণ’ প্রচারণা চালানো হলেও বাস্তবে অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। বিশুদ্ধ পানি পাওয়া কঠিন ছিল, আবার সঠিক অনুপাতে উপকরণ মিশ্রণও অনেকের পক্ষে সম্ভব হতো না। ফলে কার্যকর সমাধান হিসেবে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং এসএমসির যৌথ উদ্যোগে বাজারে আসে প্যাকেটজাত ওরস্যালাইন। সহজ ব্যবহার, নির্ভুল উপাদান এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণের সুবিধার কারণে এটি দ্রুত মানুষের আস্থা অর্জন করে।
তিনি জানান, শুরুতে বাজারে ওরস্যালাইনের প্রাপ্যতা খুব সীমিত ছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা কম ছিল। একটি সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসএমসি শুধু উৎপাদনের দিকেই নজর দেয়নি; বরং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ওরস্যালাইন পৌঁছে দিতে ব্যাপক বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। প্রথমদিকে টোল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদন চললেও ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে ২০০৪ সালে নিজস্ব উৎপাদন কারখানা স্থাপন করা হয়।
বর্তমানে এসএমসি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মান অনুসরণ করে বছরে প্রায় ১২০ কোটি প্যাকেট ওরস্যালাইন উৎপাদন করছে। দেশের বাজারে তাদের অংশীদারিত্ব ৯০ শতাংশেরও বেশি। সায়েফ নাসির বলেন, এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক সাফল্য নয়; বরং বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে ওরস্যালাইনের ব্যবহারেও পরিবর্তন এসেছে। আগে এটি মূলত ডায়রিয়া ও কলেরা রোগীদের জন্য ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এখন বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নতির ফলে রোগের ধরন বদলেছে। বর্তমানে অতিরিক্ত গরম, শারীরিক পরিশ্রম কিংবা শরীরের পানিশূন্যতা দূর করতেও ওরস্যালাইন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কৃষক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, খেলোয়াড়সহ যারা দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করেন, তাদের জন্যও এটি একটি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
আগামী দিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে সায়েফ নাসির বলেন, এসএমসির মূল লক্ষ্য পণ্যের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে এটিকে আরও ব্যবহারবান্ধব করা। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে এমন পণ্য তৈরি করা হচ্ছে, যা আরও দ্রুত পানিতে মিশবে এবং ব্যবহারকারীদের জন্য আরও সহজ হবে। নতুন প্রজন্মের চাহিদা বিবেচনায় রেখে নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ওপর গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
বাজারে নকল ও ভেজাল পণ্যের বিস্তারকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষায়, এসএমসির দীর্ঘদিনের সুনামকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী একই ধরনের নাম ও প্যাকেজিং ব্যবহার করে নিম্নমানের পণ্য বাজারজাত করার চেষ্টা করছে। এসব প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা নিয়মিত বাজার তদারকি করেন। কোথাও ভেজাল পণ্যের তথ্য পাওয়া গেলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ভবিষ্যতে নকল প্রতিরোধে আরও আধুনিক ও নিরাপদ প্যাকেজিং প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সায়েফ নাসির বলেন, এসএমসি একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। তাই প্রতিষ্ঠানটির আয় কোনো ব্যক্তি বা শেয়ারহোল্ডারের কাছে যায় না। স্যালাইন, পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী, স্যানিটারি ন্যাপকিন, ডায়াপারসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থ জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন বিনিয়োগ এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে ব্যয় করা হয়। তার মতে, একজন মানুষ যখন এসএমসির একটি পণ্য কেনেন, তখন তিনি পরোক্ষভাবে দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নেও অবদান রাখেন।
তবে এই সাফল্যের পথ এখন চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। সায়েফ নাসির জানান, ওরস্যালাইনের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ ফয়েল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক ও কর উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। উচ্চগতির উৎপাদন লাইনের জন্য এই বিশেষ ফয়েলের বিকল্প নেই। অন্যদিকে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে। কিন্তু ওরস্যালাইন একটি জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজনীয় পণ্য হওয়ায় এর মূল্য বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি জানান, এই পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে শুল্ক কমানোর আবেদন করা হয়েছে। সরকারের নীতিগত সহায়তা পাওয়া গেলে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে আরও কম খরচে উৎপাদন এবং দেশের সব অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সায়েফ নাসিরের বিশ্বাস, মানুষের আস্থা, আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ই এসএমসিকে বিশ্বের শীর্ষ ওরস্যালাইন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। ভবিষ্যতেও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, মানসম্মত উৎপাদন এবং নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যেতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।