চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ২৫ টাকায় বিদ্যুৎ কিনবে সরকার
ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের সংকট মোকাবিলায় বর্জ্যকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রাজধানীর আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্পে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ২৫ টাকা দরে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রচলিত বিদ্যুতের দামের তুলনায় এই প্রকল্পের বিদ্যুৎ ব্যয়বহুল হলেও এর মাধ্যমে একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুবিধা পাওয়া যাবে। প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব কোনো বিনিয়োগও করতে হবে না।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। প্রকল্পটির উৎপাদনক্ষমতা হবে ৪২ মেগাওয়াট। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। সে হিসাবে ২০২৮ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বর নাগাদ এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ২৫ টাকা ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রকল্পটিকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাব দিয়ে বিচার করলে এর প্রকৃত সুবিধা বোঝা যাবে না। কারণ, এই প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি রাজধানীর বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজও হবে।
ঢাকা শহরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে ল্যান্ডফিলে জমা হচ্ছে। এতে একদিকে ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ, দূষণ ও পরিবেশগত নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রচলিত পদ্ধতিতে মূলত বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা হয়। কিন্তু বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই উদ্যোগে সেই বর্জ্যকেই অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক বেশি হলেও বর্জ্য অপসারণের সুবিধা, পরিবেশগত লাভ এবং কার্বন ক্রেডিটের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে প্রকল্পটির সামগ্রিক অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব হবে।
কার্বন ক্রেডিটের বিষয়টিও এ প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমানো গেলে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে এর আর্থিক মূল্য তৈরি হতে পারে। ফলে বিদ্যুতের জন্য বেশি দাম দেওয়ার একটি অংশ অন্য পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে সমন্বয় করার সুযোগ থাকবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারকে সরাসরি বিনিয়োগ করতে হবে না। চীনা বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের চাপ ছাড়াই একটি বড় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রকল্পটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ একই বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ এবং সার—দুই ধরনের সম্পদ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আমিনবাজারের ল্যান্ডফিল ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনকে নিয়মিত মাসিক ভাড়া দেবে। ফলে প্রকল্পটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানও একটি নিয়মিত রাজস্ব আয়ের সুযোগ পাবে।
সরকারের পরিকল্পনা শুধু আমিনবাজারে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বর্জ্য ব্যবহার করেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ জন্য চীনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার চায়না’র সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বড় দুটি বর্জ্যভাণ্ডারকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
তবে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, প্রযুক্তির সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রচলিত ব্যয়ের তুলনায় এটি সরকারের জন্য বাড়তি ব্যয় তৈরি করতে পারে। তাই প্রকল্পটির সাফল্য নির্ভর করবে শুধু নির্ধারিত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নয়; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে কতটা পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, তার ওপরও।
তারপরও ঢাকার ক্রমবর্ধমান বর্জ্য সমস্যা বিবেচনায় বর্জ্যকে শুধু আবর্জনা হিসেবে না দেখে সম্পদে রূপান্তরের এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমিনবাজার প্রকল্প সফল হলে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য বড় শহরেও একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, আমিনবাজার প্রকল্প থেকে ৪২ মেগাওয়াট এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিল থেকে আরও ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ মিলিয়ে ঢাকার বর্জ্য থেকে প্রায় ৮২ থেকে ৯২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জৈব সার উৎপাদন, ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ কমানো এবং পরিবেশগত সুবিধা।
ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন মডেল তৈরি হতে পারে—যেখানে বর্জ্য অপসারণের খরচের পরিবর্তে বর্জ্য থেকেই বিদ্যুৎ, সার এবং সম্ভাব্য কার্বন ক্রেডিটের মতো অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হবে। তবে সেই মডেল কতটা টেকসই ও ব্যয়সাশ্রয়ী হবে, তা নির্ধারণ করবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার সক্ষমতা।